দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘতম নদ ভৈরব। মূলত একসময় গঙ্গা-পদ্মার সম্মিলিত প্রবাহে প্রমত্ত রূপ ধারণ করেছিল ভৈরব। কিন্তু এই তিলত্তমা ভৈরবকে কালে কালে হত্যা করা হয়েছে। নদটির ছিল দুটি উৎসমুখ। প্রথমটি ছিল ভারতে। গঙ্গার পানি জলঙ্গী নদী দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া হয়ে বাংলাদেশের মেহেরপুরের শোলমারী দিয়ে ঢুকে ভৈরবে পড়ত। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে ভারতের হাগনাগাড়ি এলাকায় বাঁধ নির্মাণের ফলে জলঙ্গীর পানি ভৈরবে ঢোকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে পদ্মার পানি মাথাভাঙ্গা নদী হয়ে চুয়াডাঙ্গার সুবলপুর এলাকা দিয়ে ভৈরবে প্রবেশ করত।
কিন্তু ১৮৬১ সালে দর্শনায় সংকীর্ণ রেলসেতু নির্মাণের ফলে দ্বিতীয় এ সংযোগ দিয়েও ভৈরবে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। এরপর দর্শনায় কেরু চিনিকল স্থাপনের জন্য ১৯৩৮ সালে ভৈরব নদের একটি বাঁক ভরাট করে দেওয়া হয়। ১৯৬০ সালের দিকে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্পের আওতায় নবগঙ্গা নদীতে স্লুইসগেট নির্মাণের কারণেও ভৈরবের পানিপ্রবাহ কমে যায়।
এভাবে একপর্যায়ে ভৈরব উজান থেকে আসা স্বাভাবিক পানির প্রবাহ একেবারেই হারিয়ে ফেলে। এর প্রভাব পড়ে ভৈরবসহ এর শাখা নদী কপোতাক্ষ, চিত্রা, হরিহর, বেতনা, মুক্তেশ্বরী, ভদ্রাসহ ছোট-বড় ১৩টি নদীর ওপর। এসব নদীই আজ মৃতপ্রায়। এর মধ্যে কয়েক দশক ভৈরবকে বাঁচাতে আন্দোলনে নামে লাখো মানুষ।
স্থানীয় দাবির মুখে ২০১৬ সালে সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভৈরব নদ খননের উদ্যোগ নেয়। ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চৌগাছার তাহেরপুর থেকে সদর উপজেলার বসুন্দিয়া পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং বসুন্দিয়া থেকে আফ্রা ঘাট পর্যন্ত চার কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়। ২০২৩ সালের ৩০ জুন এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু এর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। ভৈরবে জোয়ার-ভাটা আসেনি। নদ আগের মতোই বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। কচুরিপানায় ভরে গেছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান থেকে আসা পদ্মার পানির জন্য মাথাভাঙ্গার সঙ্গে ভৈরবের সংযোগও পুনঃস্থাপন করতে হবে। তাহলেই কেবল এর সুফল পাওয়া সম্ভব। উৎসে খনন না করে অজায়গায় (ভিতরে) খনন করলে শুধু টাকার অপচয়ই হবে। এই কাজের সুফল কখনই পাওয়া যাবে না।
সরেজমিন ও বিভিন্ন উৎস থেকে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নদটির ওপর ছোট-বড় ৫২টি সেতু অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা রয়েছে। বিষয়টি এ ধরনের যে যেখানে ভৈরবের প্রশস্ততা ১৫০ থেকে ২৫০ ফুট, সেখানে বেশির ভাগ সেতুর দৈর্ঘ্য ১৬ থেকে ১২০ ফুটের মধ্যে। অর্থাৎ নদটিকে সরু নালায় পরিণত করার চেষ্টা। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, ভৈরব নদের ওপর থাকা সেতুগুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের।
সংকীর্ণ এসব সেতু অপসারণ করে নদের প্রশস্ততা অনুযায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ও কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, অপরিকল্পিতভাবে তৈরি সংকীর্ণ এসব সেতু অপসারণ তো করতেই হবে, তিনি বলেন, ভৈরব ও তার ১৩টি শাখা-প্রশাখার ওপর যেমন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি জড়িত, তেমনি এর সঙ্গে মংলা সমুদ্রবন্দর ও নওয়াপাড়া নৌবন্দরের অস্তিত্বও জড়িত।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, লোনা পানি ও মিঠাপানির মিশ্রণস্থলে যে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের সৃষ্টি, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ না এলে সেই সুন্দরবনও হুমকির মুখে পড়বে। ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু লোনা পানির জোয়ার-ভাটাকে ভাটি থেকে কতটা উজানে আনা যায়, সেই চেষ্টা করছে। কিন্তু উজান থেকে পদ্মার মিঠাপানি ভাটিতে নেওয়ার কোনো চেষ্টা তাদের নেই।
দুটো কাজই একসঙ্গে করার দাবি করে তিনি বলেন, উজানে মাথাভাঙ্গার সঙ্গে ভৈরবের পুনঃসংযোগ করলে একসঙ্গে অনেক লাভ হবে। বর্ষাকালে পদ্মায় পানির যে চাপ তৈরি হয়, তাতে ঢাকা পর্যন্ত বন্যা হয়। মাথাভাঙ্গার সঙ্গে ভৈরবের সংযোগ হলে পদ্মার চাপ অনেকটাই ভৈরবের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের যে কথা শোনা যাচ্ছে, তার অন্যতম উদ্দেশ্যও তাই।
কিন্তু মাথাভাঙ্গার সঙ্গে ভৈরবের সংযোগ না করলে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সে উদ্দেশ্য সফল হবে না। তিনি বলেন, পদ্মার পানি ভৈরবে আসা শুরু হলে ভৈরবসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে স্রোত বাড়বে। এতে নদীগুলোর প্রশস্ততাও বাড়বে। এর দুই তীরে গড়ে ওঠা শহর, নগর, গঞ্জ, সমুদ্র ও নৌবন্দরগুলোতে প্রাণের সঞ্চার হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়বে। কৃষিতে খরচ কমবে, উৎপাদন বাড়বে। বেঁচে যাবে সুন্দরবনও। সূত্র: বিডি-প্রতিদিন