দীর্ঘ নয় মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। পর্যটকবাহী জাহাজের আগমন ঘিরে বৃহস্পতিবার দ্বীপজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পর্যটকদের পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের কাছে দিনটি যেন ঈদের আনন্দের মতো। কারণ, পর্যটকদের সঙ্গে ফিরতে শুরু করেছে জীবিকা ও কর্মব্যস্ততাও।
কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যেতে খরচ কত
কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাট থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিনে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, বার আউলিয়াসহ বিভিন্ন পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করে। কক্সবাজার শহর থেকে জেটি ঘাটে যেতে ১৫০ টাকা লাগে টমটম ভাড়া। সেখান থেকে জাহাজের টিকিট জনপ্রতি ৪ হাজার ২০০ টাকা। এই টাকায় কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়া যাচ্ছে। এরপর দ্বীপে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল ও কটেজ। এর মধ্যে ইকোনমি হোটেল/রিসোর্টের ভাড়া দুই হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা। স্ট্যান্ডার্ড হোটেল/রিসোর্টের ভাড়া চার হাজার ৫০০ থেকে সাত হাজার টাকা। প্রিমিয়াম রিসোর্টের ভাড়া আট থেকে ১২ হাজার টাকা।
খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য খরচ
প্রতিবেলা খাবার বাবদ সাধারণ মানের রেস্তোরাঁয় ৩০০-৫০০ টাকা খরচ হয়। তিন বেলায় প্রতিদিন থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। দ্বীপে যাতায়াত ও ব্যক্তিগত খরচে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা লাগে।
বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে ভিড়ে এমভি বার আউলিয়া জাহাজ। প্রায় ছয় ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে দ্বীপে পৌঁছান পর্যটকেরা। জাহাজ থেকে নামার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা ফুল দিয়ে তাদের স্বাগত জানান। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আনাগোনায় দ্বীপের পরিবেশেও ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য।
এর আগে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে ৮৩৭ জন যাত্রী নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। প্রায় নয় মাস পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দ্বীপের পর্যটন খাতে নতুন করে গতি ফেরার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৮০০ জনের বেশি পর্যটক নিয়ে এমভি বার আউলিয়া জাহাজটি ঘাটে ভিড়েছে। তাদের স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। এ সময় দ্বীপে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়। ঘাটে স্থানীয় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিনে আসা ঢাকার পর্যটক মোহাম্মদ নাহিদের কাছে দ্বীপে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা ছিল আবেগঘন। তিনি বলেন, ‘প্রথমবার সেন্টমার্টিনে পা রেখে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। নৌযাত্রাটা দারুণ ছিল। দ্বীপে নামার পরই মনে হলো, স্বর্গে চলে এসেছি। এত দিন অপেক্ষা করে এসে সত্যিই ভালো লাগছে। দ্বীপে প্রবেশের সময় কিউআর কোড স্ক্যান ও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি খুব ভালো লেগেছে। নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা দেখে অভিভূত।’
পর্যটকদের এই আগমন শুধু ভ্রমণপিপাসুদের আনন্দের উপলক্ষ নয়, দ্বীপের অসংখ্য মানুষের কাছে জীবিকা ফিরে পাওয়ার বার্তাও। পর্যটন বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন রেস্তোরাঁ চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী হামিদ হোসেনকে। পর্যটক আসায় আবার দোকান খুলেছেন তিনি। তার চোখেমুখে এখন স্বস্তির ছাপ।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জয়নাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ ছিল। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়েছে। আজ আবার মানুষ দেখছি, দোকান খুলেছি। মনে হলো, দ্বীপটা আবার বেঁচে উঠেছে। এককথায়, আমাদের কাছে এটি ঈদের আনন্দের মতো।’
একই প্রত্যাশা স্থানীয় তরুণ মোহাম্মদ রহমতেরও। লেখাপড়ার পাশাপাশি পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে এই পেশায় জড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর্যটন বন্ধ থাকায় সংসারেও টানাপোড়েন চলছিল। আজ থেকে পর্যটকদের আগমনে কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। পাশাপাশি জীবিকার চাকাও ঘুরবে। তবে এবার পরিবেশের জন্য নির্ধারিত নিয়মকানুন যাতে কেউ ভঙ্গ না করেন, সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি।’
পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ ও নিয়ম মেনে দ্বীপে অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রস্তুতি। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে জাহাজ থেকে পর্যটকদের নামা শুরু হয়। আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে নিয়মকানুন মেনে চলেন, সে জন্য মাইকিং করা হয়। পাশাপাশি তারা যাতে কোনও হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
স্কোয়াব সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি জাহাজ। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে ৫ নভেম্বর থেকে। এ সময় দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রয়েছে। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এ ছাড়া ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দ্বীপে বেশ কিছু বিধিনিষেধও বহাল রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়—এমন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম ঘিরে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের প্রত্যাশা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সরকারি নির্দেশনা মেনে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হলে দ্বীপের পর্যটন খাতের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও সচল থাকবে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন