চট্টগ্রামের দ্বিতীয় সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সড়ক ও বাঁধের বাকলিয়া কলেজ ও কালুরঘাট অংশে মাত্র ২শ’ মিটার কাজ বাকি রয়েছে। এই কাজ শেষ হলে এটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। নগরীর ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানিবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং কর্ণফুলী নদীর তীর ঘিরে নতুন নগরজীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ।
দুই হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে রয়েছে নয় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক-কাম নগর রক্ষা বাঁধ। বাঁধে রয়েছে বোটপাসসহ ১২টি আধুনিক সøুইসগেট। সড়কে রয়েছে প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে। এই সড়কটি চালু হলে নগরীর কালুরঘাট থেকে মাত্র ১০ মিনিটে পৌঁছানো যাবে কর্ণফুলী সেতুতে। পানিবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে বাকলিয়া, চান্দগাঁওসহ নগরীর বিশাল এলাকা। আর নদী তীরে আবাসন, শিল্পায়ন ও পর্যটনে যোগ হবে নতুন মাত্রা। এ মেগা প্রকল্পে কর্ণফুলীর তীরে সম্ভাবনা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
আগেই নগরীর পতেঙ্গা সৈকত থেকে সাগরিকা হয়ে ফৌজদারহাট পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রথম সিটি আউটার রিং রোডটি চালু হয়। প্রায় দুই হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটি চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত বিমানবন্দর, কর্ণফুলী টানেল হয়ে চট্টগ্রাম নগরী এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করেছে। সাগরতীরের এই সড়ক ঘিরে আবাসন, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত সড়ক-কাম বাঁধ চট্টগ্রাম আউটার রিং রোড প্রকল্প-২ হিসেবে পরিচিত। এই প্রকল্প ছিল মাত্র তিন বছরের। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে যথাসময়ে কাজ শেষ হয়নি। দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় এবং সময় বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ গণনা শুরু হয় ২০১৭ সালের জুলাই থেকে। তবে কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের অক্টোবরে। মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল দুই হাজার ২৭৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। পরে প্রথম ও দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর পর সর্বশেষ ব্যয় দাঁড়ায় দুই হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, বক্সিরহাট, বৃহত্তর বাকলিয়া, চান্দগাঁও, কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা এবং সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে এই সড়ক করা হচ্ছে। নগরীর যান চলাচলে গতি আনা, পিছিয়ে থাকা এলাকার জীবনমান উন্নয়ন, পর্যটন এবং আবাসনসহ সার্বিক ক্ষেত্রে শহর রক্ষা বাঁধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী রাজিব দাশ গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, পুরো প্রকল্পের কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। কর্ণফুলী সেতু প্রান্তের বাকলিয় কলেজ এলাকায় কিছু এবং কালুরঘাট অংশে কিছু মিলিয়ে ২০০ মিটারের মতো সড়কের কাজ চলমান আছে। কলেজ এলাকায় একটি পুকুর ভরাটের কাজ চলছে। আর কালুরঘাট এলাকায় কয়েকটি বসতি উচ্ছেদ ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। দ্রুত ওই দুই অংশের কাজ শেষ হলে সড়কটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
জানা গেছে, প্রকল্পের নয় কিলোমিটার সড়কটির কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এরইমধ্যে রাস্তার কার্পেটিং করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০ ফুট উচ্চতার ৪ লেনের সড়ক কাম শহর রক্ষা বাঁধে বর্ষায় নগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য ১২টি সøুইসগেট রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি সøুইসগেটের জন্য বসানো হচ্ছে পাম্প। নদীতীরভিত্তিক বিনোদন অবকাঠামো এবং প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে রয়েছে। নদী তীরে স্থাপিত ব্লকে রয়েছে মানুষের বসার ব্যবস্থা। এই প্রকল্পের ফলে কর্ণফুলী নদীর তীরজুড়ে তৈরি হয়েছে একটি উন্মুক্ত জনপরিসর। সেখানে নগরবাসী হাঁটতে, অবসর কাটাতে এবং নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছেন। প্রকল্পটি চালু না হলেও প্রতিদিন বিশেষ করে ছুটির দিন বিকেলে সেখানে হাজারে মানুষের ঢল নামছে। লোকজন নদীতীরে সময় কাটাতে ছুটছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের আদলে এই এলাকা ভবিষ্যতে চট্টগ্রামে অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। সড়কটি চালু হলে নগরীর দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় ওই এলাকায় জমির দাম বেড়ে গেছে। কর্ণফুলী নদীর আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠছে আবাসন, বাণিজ্য ও পর্যটনশিল্প। পাল্টে যাচ্ছে বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও মোহরা এলাকার দৃশ্যপট।
সূত্র : ইনকিলাব