হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ শর্ত অনুমোদন করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছে, ‘চলতি নভেম্বর মাসেই চুক্তি হতে পারে।’
চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না, যা বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয়েও জাপানি কনসোর্টিয়ামকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বিকল্প কোনো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান না রেখে একক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং জাপান নিজেদের অনুকূলে সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।
চুক্তির আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ চারটি শর্ত অনুমোদন করেছে। এগুলো হচ্ছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরু না করা, রাজস্ব ভাগাভাগির অনুপাত, বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনসংক্রান্ত বিধান, নির্মাণত্রুটির দায় বহনের মেয়াদ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত প্রয়োগ।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জাপানি কনসোর্টিয়ামের এসব শর্ত অনুমোদন করেছে বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের ভেতরে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না
এর আগে বেবিচক জাপানের দেওয়া এসব শর্তে রাজি না হলেও, এবার জাপানে গিয়ে তাদের সব শর্তেই সম্মতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, চুক্তির অন্যতম শর্ত- শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের ভেতরে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না। অবশ্য এই নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নতুন বিমানবন্দর পরিকল্পনা, নির্মাণ কিংবা সামরিক বিমান ঘাটি স্থাপনে কোনো বাধা থাকবে না, তবে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালানো নিষিদ্ধ থাকবে।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রভাব
এদিকে এই শর্তের প্রভাব কেবল তৃতীয় টার্মিনালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিমানবন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে বর্তমানে মাত্র একটি মাত্র রানওয়ে রয়েছে এবং চারপাশের ঘন নগরায়ণের কারণে নতুন রানওয়ে তৈরির সুযোগও বেশ সীমিত। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প বিমানবন্দরের যে ভাবনা সরকারের ছিল, এই শর্তের ফলে তা আপাতত স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত রানওয়ের অভাবে উড়োজাহাজ চলাচলের সক্ষমতা সীমিতই থেকে যেতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এককভাবে আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হয়েছে। বিকল্প কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আলোচনায় না থাকায় বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে পড়েছে। একমাত্র সম্ভাব্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা জাপানি কনসোর্টিয়ামকে নিজেদের অনুকূলে ক্রমাগত আরও সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের সুযোগ দিয়েছে-------বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান
রাজস্ব ভাগাভাগির শর্ত
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রাজস্ব ভাগাভাগি। চুক্তি অনুযায়ী, জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে মোট রাজস্বের ২৭ শতাংশ দিতে সম্মত হয়েছিল। তবে নতুন শর্তানুযায়ী, থার্ড টার্মিনাল যতদিন আংশিক চালু থাকবে, ততদিন রাজস্বের এই অংশ কম থাকবে। টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পর বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী ২৭ শতাংশ রাজস্ব পাবে।
উল্লেখ্য, আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
বিমান বাংলাদেশের কাজ পৃথক
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিমানবন্দরে একই সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনাকারী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। তবে জাপানি কনসোর্টিয়াম স্পষ্ট করেছে, বিমানের এই দুই ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ পৃথক থাকবে। কনসেশন চুক্তিতে বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, উড়োজাহাজ পরিচালনা সংক্রান্ত অর্থ পরিশোধ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেব করা হবে।
এদিকে মন্ত্রণালয় এসব শর্ত অনুমোদন করলেও চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় বিষয়গুলো ঠিক কী ভাষায় বা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এককভাবে আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
তিনি বলেন, বিকল্প কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আলোচনায় না থাকায় বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে পড়েছে। একমাত্র সম্ভাব্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা জাপানি কনসোর্টিয়ামকে নিজেদের অনুকূলে ক্রমাগত আরও সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের সুযোগ দিয়েছে।
সূত্র : ঢাকা পোস্ট