বাড়ি বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইট-সিমেন্টের দেওয়াল, ছাদ, জানালা আর দরজা। কিন্তু যদি বলা হয়, এমন এক গ্রাম রয়েছে যেখানে বাড়ির ছাদ মাটির সমান, আর গোটা বাড়িটাই মাটির তলায়! শুনতে রূপকথার মতো লাগলেও চীনের হেনান প্রদেশের কাছে সানমেনশিয়া শহরের আশপাশে রয়েছে এমনই এক আশ্চর্য জনপদ। সেখানে মাটির উপরে বহুতল বাড়ি নয়, বরং মাটির গভীরে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি। বাইরে থেকে তাকালে মনে হতে পারে, বিস্তীর্ণ জমির মধ্যে কয়েকটি উঠোন আর গর্ত ছাড়া কিছুই নেই। অথচ সেই মাটির নীচেই রয়েছে শোওয়ার ঘর, বসার ঘর, রান্নাঘর-সহ সংসারের যাবতীয় আয়োজন!
মাটির নীচে বাড়ি, উপরেই উঠোন!
এই বাড়িগুলিকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘ইয়াওদং’। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে এমন গুহা-বাড়ি তৈরির প্রচলন রয়েছে। সানমেনশিয়ার আশপাশের এই জনপদেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এ ধরনের বাড়িতে বসবাস করে আসছেন। কিছু বাড়ির ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বলে মনে করা হয়। তবে চিনের অন্যান্য অঞ্চলে মাটির গুহায় বসবাসের ঐতিহ্য আরও প্রাচীন।
বাড়ি তৈরির পদ্ধতিটিও বেশ অদ্ভুত। প্রথমে মাটির মধ্যে বড় চৌকো গর্ত খোঁড়া হয়। তার পর গর্তের চারপাশের দেওয়ালে তৈরি করা হয় ঘর। কোনও কোনও বাড়িতে উঠোনের চারপাশে একাধিক ঘর থাকে। বাইরে থেকে সেগুলির প্রবেশপথ দেখা গেলেও, ভিতরে যে আস্ত একটা সংসার রয়েছে, তা প্রথম দর্শনে বোঝা বেশ কঠিন। মজার বিষয়, বাড়ির উপরের সমতল জমিতে অনেকে হাঁটাচলা করেন, চাষবাসও করেন। অথচ তাদের পায়ের নীচেই থাকতে পারে কারও শোওয়ার ঘর কিংবা রান্নাঘর!
বাইরে গরম, ভিতরে আরাম!
মাটির নীচে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল তাপমাত্রার ভারসাম্য। গরমকালে বাইরে যখন রোদের তেজে হাঁসফাঁস অবস্থা, তখন মাটির গভীরে থাকা ঘর তুলনায় ঠান্ডা থাকে। আবার শীতকালে বাইরের তীব্র ঠান্ডা থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দেয় মাটি। ফলে সব সময় পাখা, হিটার কিংবা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের উপর নির্ভর করতে হয় না। প্রকৃতিই যেন বাড়ির জন্য তৈরি করে দিয়েছে প্রাকৃতিক তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা!
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই বাড়িগুলি বাইরের শব্দও অনেকটা আটকে রাখতে পারে। তবে ভূমিকম্প প্রতিরোধের ক্ষমতা নির্ভর করে মাটির ধরন, নির্মাণপদ্ধতি ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর। তাই সব মাটির নীচের বাড়িই যে ভূমিকম্পে নিরাপদ, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গুহার ভিতরেও আধুনিক সংসার
মাটির নীচে থাকলেই যে জীবনযাপন আদিম যুগের মতো হবে, তা কিন্তু নয়। এই বাড়িগুলিতে রয়েছে আলাদা শোওয়ার ঘর, বসার ঘর ও রান্নাঘর। অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ এবং নিকাশি ব্যবস্থারও সুবিধা রয়েছে। রান্নাঘরে ধোঁয়া বেরিয়ে যাওয়ার জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থা। এমনকী গৃহপালিত পশু রাখার জন্যও কিছু বাড়িতে আলাদা জায়গা রয়েছে।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে দেখলে বাড়ি বলে কিছুই মনে হবে না, কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যাবে, আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় অনেক ব্যবস্থাই রয়েছে সেখানে। মাটির নীচে বসে গল্প করা, টেলিভিশন দেখা কিংবা পরিবারের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া—সবই চলে স্বাভাবিক নিয়মে। শুধু বাড়ির ছাদটা মাথার উপর নয়, মাথার অনেকটা উপরে মাটির স্তর!
হাজার হাজার ঘর, কয়েক হাজার পরিবার
এই অঞ্চলের মাটির নীচের বসতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে হাজার হাজার ঘর এবং কয়েক হাজার পরিবারের বসবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘরের সংখ্যা ও বাসিন্দার সঠিক হিসাব সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। বহু বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলি শুধু থাকার জায়গা নয়, চিনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও জীবনযাত্রারও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
মাটির উপর বাড়ি তৈরির জন্য যেমন আলাদা জমি ও নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজন হয়, তেমনই মাটির নীচে বাড়ি তৈরি করলে জমির ব্যবহারেও কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। বিশেষ করে যেখানে মাটির গঠন উপযুক্ত, সেখানে এই পদ্ধতি স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক অভিনব উপায়।
এ বার পর্যটকদেরও আকর্ষণ
এমন অদ্ভুত বাড়ির কথা শুনে কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। তাই এই ঐতিহ্যবাহী বসতিগুলিকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও দর্শনার্থীদের জন্য পুরনো বাড়ি দেখার কিংবা সেখানে থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে ভাড়া ও কেনার দাম জায়গা, বাড়ির অবস্থা এবং সময় অনুযায়ী বদলে যায়।
ভাবুন তো, ছুটি কাটাতে গিয়ে এমন এক বাড়িতে রাত কাটাচ্ছেন, যার ছাদ আসলে মাটির বিশাল স্তর! সকালে জানালা খুলে পাহাড় বা সমুদ্র দেখার বদলে সামনে হয়তো দেখা যাবে মাটির দেওয়াল আর ছোট্ট উঠোন। আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে উপরে উঠতেই হাজির খোলা আকাশ!
সব মিলিয়ে, চীনের এই মাটির নীচের গ্রাম প্রমাণ করে, বাড়ি মানেই যে আকাশছোঁয়া দেওয়াল আর উঁচু ছাদ হতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। কোথাও মানুষ আকাশের দিকে বাড়ি তোলে, আর কোথাও গোটা সংসার গড়ে নেয় মাটির গভীরে। বাইরে থেকে রহস্যময়, ভিতরে একেবারে ঘরোয়া। এই জনপদ যেন মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা এক অন্য পৃথিবী! সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন