শিরোনাম
◈ সপ্তাহে একদিন বিনামূল্যে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন করবে শিক্ষার্থীরা ◈ ভূমধ্যসাগরে দুই দিন তিন রাত ভাসার পর উদ্ধার ১৫ বাংলাদেশি ◈ ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি, বাতিল ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা ◈ ভুয়া কনের ফাঁদে নিঃসঙ্গ চীনা পুরুষেরা, গড়ে উঠেছে প্রতারক ম্যাচমেকিং (ভিডিও) ◈ পশ্চিমবঙ্গে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’: আদালতের বাইরে আটক ও বিচার ছাড়াই বাংলাদেশিদের ‘পুশব্যাক’ ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে, চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ইসি-সংসদ সচিবালয়ের বৈঠক ◈ গোটা প‌রিবার‌কে প্রা‌ণে মে‌রে ফেলার হুম‌কি দি‌য়ে সৌরভ গাঙ্গু‌লি ও স্ত্রী ডোনা‌কে চিঠি! সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তোলপাড়  ◈ ইংল‌্যা‌ন্ডের ফুটবল ক্লাব লিভারপুল কেনার দৌড়ে ভারতীয় শিল্পপতি, সঙ্গে বেজোস-সাভেরিন ◈ চাঁদপুরে বাস-হাইড্রোলিক ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৩ ও ১৫ জন আহত ◈ শিক্ষায় বেহাল অবস্থা, একাদশে ১৫ লাখ আসন ফাঁকা থাকার শঙ্কা!

প্রকাশিত : ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৯ দুপুর
আপডেট : ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০১:২৯ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’: আদালতের বাইরে আটক ও বিচার ছাড়াই বাংলাদেশিদের ‘পুশব্যাক’

টেলিগ্রাফের নিবন্ধ: তেঁতুলিয়া উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট-১ ব্লকে, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থিত। হোল্ডিং সেন্টারগুলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ বা ‘শনাক্ত করো, বাদ দাও, ফেরত পাঠাও’ নীতির মূল ভিত্তি। এর মূলে রয়েছে কথিত বিদেশিদের শনাক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া এবং কথিত বাংলাদেশিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। এসব অস্থায়ী শিবিরে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত আটকে রাখা যেতে পারে। এরপর তাদের ‘পুশব্যাক’ করা হয়। অর্থাৎ কোনো বিচার ছাড়াই এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

তেঁতুলিয়ার ‘হোল্ডিং সেন্টার’টি আসলে একটি সরকারি অতিথিশালা। এর নতুন নাম দেয়া হয়েছে ‘পথের সাথী’। এর চারপাশে স্থানীয় পুলিশ ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) টহল দেয়। পথের সাথী’তে কতজনকে আটক রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কিছু বলতে চায় না। তবে ভেতর থেকে নারী ও শিশুদের নানা কণ্ঠের কোলাহল ভেসে আসে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’। বলা হয়েছে, তারা অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে ভারতে ঢুকেছে।

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে ভূমিধস জয়ে ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতিটি প্রশাসনিক ব্লককে হোল্ডিং সেন্টার স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়। সরকারি গোপনীয়তার কারণে আটক বা ‘পুশব্যাক’ করা ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলির তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, তাদের অধিকাংশই মুসলিম। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের আওতায় যারা নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য- অর্থাৎ হিন্দু অভিবাসীরা, তাদেরকে টার্গেট করা হবে না।

ভারতে অভিবাসীবিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আইনি কাঠামোও গড়ে উঠেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা একটি নির্বাহী আদেশের অধীনে স্থাপিত হোল্ডিং সেন্টার এবং ‘পুশব্যাক’ এমন এক অস্বচ্ছ ব্যবস্থার অংশ, যা আদালত ও জবাবদিহি প্রক্রিয়ার সমান্তরালে পরিচালিত হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরেই এমন অভিবাসন ঘটছে, যা বৈধ পথ এড়িয়ে চলে। কথিত বাংলাদেশি হিন্দুরা সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে আশ্রয় পেয়েছে। দুই দেশের সীমান্তের উভয় পাশে পারিবারিক সম্পর্ক মানুষের মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করে। শ্রমের নেটওয়ার্কগুলোও স্বল্পমেয়াদি অভিবাসীদের ভারতে নিয়ে আসে। এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ এতদিন সরকারি নজরের প্রান্তসীমায় ছিল। এখন সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়ছে। সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ)। তাদের দায়িত্ব হলো আটক ব্যক্তিদের স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দেয়া, যারা এরপর মামলা দায়ের করে।

স্থানীয় আইনজীবী এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের সদস্য পিয়ারুল ইসলাম বলেন, শুধু বসিরহাট মহকুমাতেই প্রতিবছর অবৈধ অভিবাসনসংক্রান্ত ৭০০০ থেকে ৮০০০টি মামলা হয়। এসব মামলার অধিকাংশই ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে। তারা ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র ছাড়া সীমান্তে ধরা পড়েন। তাদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইনে মামলা করা হয় এবং আদালতে হাজির করা হয়। ইসলাম আরও বলেন, এসব মামলার প্রায় ১০০০টি এমন বিদেশিদের বিরুদ্ধে, যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছেন। সম্প্রতি পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী বিচার হতো।

নতুন মামলাগুলোর বিচার হবে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫ অনুযায়ী। ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে আদালত এসব অপরাধীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা দিয়ে ছেড়ে দিত। এরপর তারা বাংলাদেশে ফিরে যেতেন অথবা তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতো। এখন আদালত আরও কঠোর হয়েছে এবং দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে।

পিয়ারুল ইসলাম বলেন, হোল্ডিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে আদালতের কোনো সম্পর্ক নেই। তার মতে, বিতর্কিত ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এ এসব কেন্দ্রকে পরোক্ষভাবে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই আইনটি পুলিশ ও অভিবাসন কর্মকর্তাদের ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা দেয়ার জন্য এবং নাগরিক ও নাগরিক নন এমন উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞ মোহসিন আলম ভাট ব্যাখ্যা করেন, কোনো বিদেশিকে আটক করতে হলে প্রথমে একটি বিচারিক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রক্রিয়া থাকতে হবে, যার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্যিই বিদেশি কি না।
আসামে ১৯৮০-এর দশকের বিদেশিবিরোধী আন্দোলনের ফলে একটি ‘বিদেশি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা’ গড়ে ওঠে, যা নিয়মিত আদালতের সমান্তরালে পরিচালিত হতো। এর মধ্যে ছিল একটি সীমান্ত পুলিশ বাহিনী। তাদের তথাকথিত অবৈধ অভিবাসীদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ছিল ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল- নাগরিকত্ব নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা আধা বিচারিক প্রতিষ্ঠান।

যাদেরকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হতো, তাদের ফরেনার্স অ্যাক্টের অধীনে স্থাপিত আটককেন্দ্রে রাখা হতো। এই ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক বলে প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে জাতিগত বাঙালিদের, যার মধ্যে মুসলিমরা উল্লেখযোগ্য, তাদেরকে টার্গেট করা হয়েছিল এবং তাদের ন্যায্য বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

তাদের অনেকেই আসলে ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। কাগজপত্রের সামান্য ভুলের কারণে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিলেন। ২০১৯ সালে আদালতের একটি আদেশে আটক রাখার সময়সীমা নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত তারাও অনির্দিষ্টকাল কারাবন্দি থাকার ঝুঁকিতে ছিলেন, কারণ বাংলাদেশ তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিত না। আসামের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত পশ্চিমবঙ্গের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ অভিযান এবার বিচারিক সিদ্ধান্তের সেই সামান্য আড়ালটুকুও সরিয়ে দিচ্ছে- যদি না আটক ব্যক্তি বা তাদের স্বজনরা আদালতে গিয়ে এর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করেন।

এই ব্যবস্থা একটি নির্বাহী আদেশ থেকে এসেছে: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গোপনীয় নির্দেশনা, যা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে আটক ও বহিষ্কারের ক্ষমতা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিজেদের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ নেই। এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে এক ধরনের নিষ্ঠুরতার প্রদর্শনও। হাকিমপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা এমন একটি পরিবারের কথা বলেছেন, যারা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েছিল। একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুরা খোলা মাঠে বসে ছিলেন। তখন প্রচণ্ড গরমে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল। এরপর তারা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল, স্থানীয় বাসিন্দারা বলতে পারেননি।

জেলার পর জেলা- গল্প একই। বিএসএফ পরিবারগুলোকে বের করে দিয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের ঢুকতে দেয়নি। ফলে তারা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েছে। এ ধরনের ‘পুশব্যাকের’ কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

মানবাধিকার আইনজীবী এবং কংগ্রেস দলের সদস্য আমান ওয়াদুদ ব্যাখ্যা করেন, বিএসএফ যদি সীমান্তে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করা মানুষকে আটকায়, তাহলে তাদের পুশব্যাক করা বৈধ হতে পারে। কিন্তু ভারতের ভূখণ্ডের ভেতরে কাউকে আটক করে স্থানীয় প্রশাসনের সামান্য যাচাইয়ের পর তাকে জোর করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো যায় না। ওয়াদুদের প্রশ্ন, যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে তারা যদি বাংলাদেশি নাগরিকই হয়ে থাকেন, তাহলে সরকার কেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে তাদের বিচার করেনি?

কিন্তু সম্ভবত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ নীতির আসল উদ্দেশ্যই হতে পারে সেটি। ভাট যেমন উল্লেখ করেছেন, এই ব্যবস্থা এমন একটি ‘অবৈধতার রাজনীতি’ ধারণ করে, যেখানে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করাকেই একটি গুণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

(ইপ্সিতা চক্রবর্তী ‘দাপান: টেলস ফ্রম কাশ্মীর’স কনফ্লিক্ট’ বইয়ের লেখক এবং জিন্দাল স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশনে শিক্ষকতা করেন। তার এ লেখাটি অনলাইন টেলিগ্রাফ থেকে অনুবাদ করেছে মানবজমিন )

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়