শিরোনাম
◈ তারেক রহমানের দিল্লি সফর ঠেকাতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘প্রভাবশালী লবি’! ◈ শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার সংস্কৃতি কী বার্তা দিচ্ছে? ◈ ভ‌্যা‌লে‌ন্সিয়ার জা‌লে বার্সেলোনার ৫ গোল  ◈ চেল‌সির বিরু‌দ্ধে অ‌নেক লড়াই ক‌রে জিত‌লো আর্সেনাল ◈ মার্কিন দূতদের সঙ্গে আলোচনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যা বললেন জেলেনস্কি ◈ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ফের ঊর্ধ্বগতি, ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে বাংলাদেশ ◈ জেলব‌ন্দি ইমরান খানের যত্ন ও সু‌চি‌কিৎসার দাবিতে সরব ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান  লারা ◈ ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি বাড়ছে না কেন? ◈ পাঁচ দিন পর ডাকসুর মেয়াদ শেষ, পরের নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ◈ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিচ্ছে সরকার

প্রকাশিত : ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৫ দুপুর
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২২ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার সংস্কৃতি কী বার্তা দিচ্ছে?

এল আর বাদল : বাংলাদেশ সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এমন ২০ জন কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ করার পর এটি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত পহেলা জুলাই সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া এবং বরখাস্ত হওয়া ১৫০ জন কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়েছিল সরকার। আওয়ামী লীগের সময়ে চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া কর্মকর্তাদে'র আবেদন পর্যালোচনা করে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তখন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল। ----- সূত্র, বি‌বি‌সি বাংলা

আবার অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশ ও জনপ্রশাসনে বহু বছর আগে স্বাভাবিক কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের অনেককে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

ওই সরকারে আমলে ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বরখাস্ত হওয়া ৮৫ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করেছিল নির্বাচন কমিশন বা ইসি। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এ ধরনের চাকরিতে পুনর্বহালের অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেই সরকারের সময়ে আবার বহু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, চাকুরিচ্যুত কিংবা নানা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের আওতায় নেওয়া হয়েছিল।

এখন আবার একই ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠছে যে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পাওয়া কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বিবেচনায় ফিরিয়ে নেওয়া কী বার্তা দিচ্ছে? কারণ একই সময় অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের এই কয়েক মাসে অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। অনেক কর্মকর্তা এখনো ওএসডি অবস্থায় আছেন।

জনপ্রশাসন কিংবা আমলাতন্ত্র বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার - যোগ্যতা দক্ষতার চেয়ে সরকারের পছন্দ অপছন্দ বা রাজনৈতিক বিবেচনাই বেশি গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টির বহিপ্রকাশ ঘটছে।

"সব সরকারের সময়েই ঘটনাগুলো ঘটে আসছে। কিন্তু দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনা করে কাউকে বিদায় করলে সরকার পরিবর্তন হলে তাদের ফিরে আসার পথ তৈরি হয়। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ফিরিয়ে আনলে সেটি রাজনৈতিক দৌরাত্মকেই শক্তিশালী করে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলছেন, সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় বা সরকার পরিবর্তনের পর কাউকে ফিরিয়ে আনা বা পদে বসানো হলে তখন সেটি অনিয়ম। রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া ব্যক্তিরাই এসব সুবিধা নেয় বলে মনে করেন তিনি।

এনবিআরের ২০ কর্মকর্তা নিয়ে যা হয়েছে

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এনবিআরের ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এসব কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তির জন্য ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। এনবিআরের এসব কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের জুন মাসে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে এনবিআরে নজিরবিহীন এক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ওই আন্দোলনের কারণে তখন দেশে রাজস্ব কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল।

তখন আন্দোলনের এক পর্যায়ে তাদের বদলি করা হলেও তারা বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। পরে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের কাউকে সাময়িক বরখাস্ত আবার কারও বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন রাষ্ট্রপতির আদেশে তাদের শাস্তি বাতিল হলো।

যদিও চলতি বছর এপ্রিলেই সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া সংযোজন করে 'সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬' জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে জনসেবার কার্যক্রম ব্যাহতকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এটি নতুন কিছু? 

দীর্ঘকাল সরকারি চাকরি করেছেন এমন অনেকেই বলছেন, এভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ও পরের সরকারের সময়ে সেটি বাতিল হয়ে যাওয়ার রেওয়াজ বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেই চালু আছে।

চলতি বছরের পহেলা জুলাইয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া এবং বরখাস্ত হওয়া দেড়শ কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়েছে সরকার।

তখন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাভাবিক অবসর, বাধ্যতামূলক অবসর বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়া ওই কর্মকর্তারা বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও পাবেন।

ঢাকা মহানগর (ডিএমপি) পুলিশের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ওবায়দুর রহমান খানের চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ ১১ বছর পর এসে গত ৬ই অগাস্ট বাতিল করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ১০ই অগাস্ট এ সম্পর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাকরিচ্যুত হওয়া, বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক অবসরে যাওয়াদের মধ্যে অনেককেই চাকরিতে ফিরিয়ে এনেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।

ওই সরকারের সময়েই ১৮ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বরখাস্ত হওয়া ৮৫ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করে নেয় নির্বাচন কমিশন বা ইসি। ২০২৫ সালের ১৮ই অগাস্ট ওই প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল কমিশন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে চাকরি হারানো ১ হাজার ৫২২ পুলিশ সদস্য চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পুলিশ সদর দপ্তর তখন অবশ্য বলেছিল, যাদের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, আর্থিক দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে ফৌজদারি মামলা রয়েছে তাদের তারা বিবেচনা করেনি।

আবার একই সময়ে অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের গত কয়েক মাসে পুলিশ ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতের অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ছাড়াও অনেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এমন ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে জুলাইয়ের শেষে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। পুলিশ প্রশাসনেও বহু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।

আওয়ামী লীগ আমলেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে তখনকার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

তাকে নিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪৫ অনুযায়ী সরকারি চাকরি হতে অবসরের কথা বলা হয়েছিল। এ ধারায় বলা হয়েছে 'কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ পঁচিশ বছর পূর্ণ হবার পর যে কোনো সময় সরকার, জনস্বার্থে, প্রয়োজনীয় মনে করলে কোনো রূপ কারণ না দেখিয়ে তাকে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করতে পারবে'।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ধারা বরাবরই রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলছেন, শাস্তি দেওয়ার মধ্যেই ভুল থাকে কিংবা শাস্তিটা অনেক সময় কারও কারও জিদের ভিত্তিতে হয়ে থাকে।

কেউ দুর্নীতি, অসদাচরণ কিংবা অন্যায় কাজ করলে প্রসিডিউর ফলো করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শোকজ, তদন্ত কমিটি, বড় শাস্তির ক্ষেত্রে পিএসসির মতামত নেওয়াসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে তখন আর প্রশ্ন উঠে না," বলছিলেন তিনি।

তার মতে, ২৫ বছর চাকরি করলে বিদায় দেওয়া যায়-এই বিধানটাই একটা কালাকানুন। এটি ব্যবহার করে দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনা করে কাউকে বিদায় করলে সরকার পরিবর্তন হলে তাদের ফিরে আসার পথ তৈরি হয় বলে মনে করেন তিনি।

অন্যায় করলে বিচার হবে কিন্তু অন্যায্য আদেশ হলে প্রশ্ন উঠে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের এভাবে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া হতাশ করে, দক্ষতা কমায় এবং সর্বোপরি আমলাতন্ত্রে দলীয় দৌরাত্ম তৈরি করে। পুনর্বিবেচনার পদ্ধতি থাকা ভালো কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে সেক্ষেত্রেও যাতে ন্যায়বিচার হয়। নাহলে ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের," বলছিলেন তিনি।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলছেন, বিভাগীয় মামলায় দণ্ড দেওয়া হলে কোন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিউ করতে পারে। এতে দণ্ড বহাল থাকলে সেটি চূড়ান্ত হয়ে যায়। এরপর তিনি অ্যাডমিনিস্ট্রিটেভি ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন। সেখান থেকে আপিল বিভাগে যেতে পারেন।

এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাজনৈতিক বিবেচনায় বা সরকার পরিবর্তনের পর কাউকে ফিরিয়ে এনে বসানো হলে তখন সেটি অনিয়ম । এটা কোনো জায়েজ হবে না। এটি হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া ব্যক্তিরা এসব সুযোগ পায়। কোনো আইন বা বিধি এটি কাভার করে না। এগুলোর কারণেই রাজনীতিকরণ বন্ধ হয় না। এটি চলতে থাকলে দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাও তৈরি হবে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

  • সর্বশেষ