সেচের পানির সন্ধানে আফগানিস্তানজুড়ে কয়েক লাখ গভীর ও সরু কূপ খনন করা হয়েছে। কাছে গিয়ে সচেতনভাবে খেয়াল না করলে সেগুলোর গভীরতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন। বর্তমানে এসব কূপ কৃষি জমিকে মরণফাঁদে পরিণত করেছে।
কূপ থেকে শিশুদের উদ্ধারের চেষ্টায় অনেকে স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগান। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কয়েক’শ আফগান শিশু পরিত্যক্ত কূপে পড়ে গেছে। সেগুলোর মুখ উন্মুক্ত ছিল।
২০২১ সাল থেকে এ ধরনের ১০০টির বেশি ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি। বেশিরভাগ ঘটেছে দক্ষিণাঞ্চলে। এর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা বেশি এবং তাদের প্রায় অর্ধেকই মারা গেছে।
দেশটির পানির উৎস নিয়ে গবেষণা করেন নাজিবুল্লাহ সাদিদ। বর্তমানে জার্মানিতে বসবাসরত এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বেশ কয়েকটি বিষয় মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
তালেবানরা ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তায় ব্যাপক কাটছাঁটের কারণে কমে গেছে কর্মসংস্থান। ফলে অনেক মানুষ আবার কৃষি কাজে ফিরে গেছে। কিন্তু এখন মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘস্থায়ী খরা।
জলাশয়গুলোতে পানি কমে যাওয়ায় কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিকৃত চীনের সস্তা সোলার প্যানেল। সাদিদ বলেন, কৃষকরা এখন মোটরের সাহায্যে সারাদিন পানি তুলতে পারেন। আর সেই পানির সন্ধানে কৃষি জমিগুলোতে শত শত গভীর গর্ত খোঁড়া হয়েছে।
নাজিবুল্লাহ সাদিদ বলেন, ২০২০ সালের পর কূপের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, বর্তমানে এর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। বেশিরভাগই হেলমান্দ নদী অববাহিকা, যেমন- হেলমান্দ, কান্দাহার, ফারাহ ও গজনি প্রদেশে অবস্থিত।
কিন্তু শিশুরা এসব কূপে পড়ে গেলে তাদের উদ্ধারের সক্ষমতা বেশ সীমিত। বর্তমানে মাত্র পাঁচজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় উদ্ধারকাজে নিয়োজিত আছেন। এই সীমাবদ্ধতার কারণে দক্ষিণ হেলমান্দ প্রদেশের ২৮ বছর বয়সী এক মোবাইল ফোন বিক্রেতা নিজেই বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন।
একটি উদ্ধার অভিযান
পানির সন্ধানে খনন করায় গর্তগুলোর প্রশস্ততা খুবই কম হয়। প্রাপ্তবয়স্ক কারও পক্ষে সেগুলোতে পড়ে যাওয়া কিংবা নামা প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় কান্দাহারের এমনই একটি কূপে পড়ে যায় ৫ বছর বয়সী জয়নুল্লাহ।
শিশুটি যে কূপে পড়েছিল, সেটি খনন করা হয়েছিল দুই বছর আগে। কৃষকরা তখন এর মুখ কাঠ ও মাটি দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠ পচে ও মাটি আলগা হয়ে যায়। সেখানে অন্তত ৭০ মিটার গভীরে পড়ে যাওয়ার পর উদ্ধারের অপেক্ষায় দুইদিন পার করে ৫ বছর বয়সী শিশুটি।
উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মিরাজান আবদুল্লাহ নামে এক মোবাইল ফোন বিক্রেতা। গত চার বছরে তিনি এমন ১৩৩টি অভিযানে অংশ নিয়ে অন্তত ৭০ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছেন।
২০২১ সাল থেকে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটনায় মিরাজান ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি যন্ত্র তৈরি করেন। যা একটি ক্যামেরাকে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ক্যামেরাটির মাধ্যমে মাটির ওপর থেকে গর্তের ভেতর আটকা পড়া শিশুর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর সেই অবস্থান অনুযায়ী দড়ি নামিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু জয়নুল্লাহকে উদ্ধারের অভিযান সহজ ছিল না। শিশুটির অবস্থান পর্যন্ত ক্যামেরা পৌঁছাতে পারছিলেন না মিরাজান। কারণ, যন্ত্রটি শুধু সোজা নিচে নামতে পারে। আর জয়নুল্লাহ গর্তের তলদেশে তৈরি হওয়া একটি ফাঁকা গহ্বরের কোণে আটকে ছিল।
তাই শিশুটিকে বাঁচাতে অন্য উপায়ের আশ্রয় নেওয়া হয়। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দড়িসহ নিচে নামানো হয় ১১ বছর বয়সী আরেক শিশু হযরতকে। একেবারে নিচে পৌঁছানোর পর সে প্রথমবারের মতো জয়নুল্লাহকে দেখতে পায়। এরপর ওপর থেকে পাঠানো দ্বিতীয় আরেকটি দড়ি জয়নুল্লাহর হাতে বেঁধে দেয়।
দড়ি টানার পর প্রথমে ওপরে উঠে আসে হযরত। কয়েক মিনিট পর জয়নুল্লাহকেও টেনে তোলা হয়। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষ বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে। আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা অ্যাম্বুলেন্সে করে শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন সে বাড়ি ফেরে।
কূপের গভীরতা বাড়ছে
পানির সন্ধানে বর্তমানে মাটির আরও গভীর পর্যন্ত গর্ত তৈরি করা হচ্ছে। একটা সময় ৮০ মিটার বা ২৬০ ফুট গভীরেও পানি পাওয়া যেত। এখন ২০০ মিটার বা ৬৬০ ফুট পর্যন্ত গভীর করা হচ্ছে।
নাজিবুল্লাহ সাদিদ বলেন, পানি না থাকায় আগামীতে কিছু এলাকা জনশূন্য হয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ হয়তো দেশান্তরী হবে। অনেক অঞ্চল অনুর্বর প্রান্তরেও পরিণত হতে পারে।
সাদিদ বলেন, সাধারণত ১ কেজি টমেটো ফলাতে ১০০ থেকে ৩০০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ওই ১ কেজি টমেটো বাজারে বিক্রি হয় মাত্র ৫ বা ১০ আফগানি মুদ্রায়। যা ০.০৮ থেকে ০.১৬ ডলারের সমান।
খনন করা কূপগুলোতে যখন পানি শুকিয়ে যায় তখন সেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। অর্থ সংকটে সেগুলো যথাযথভাবে ঢেকে রাখতেও আগ্রহ পান না কৃষকরা। বিবিসিকে কয়েকজন বলেছেন, জননিরাপত্তা তাদের কাছে উদ্বেগের প্রধান বিষয় নয়।
সূত্র: সমকাল