শিরোনাম
◈ হাম কেড়ে নিল আরও ৪ শিশুর প্রাণ, মৃত্যু বেড়ে ৮০০ ছুঁই ছুঁই ◈ সরকারের ঋণ বেড়েছে ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা, ১০ মাসেই ছাড়াল লক্ষ্যমাত্রার ৮৪% ◈ দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম ◈ জিয়াউর রহমানকে হত্যা: বৃহস্পতিবার মোজাফফরকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ ◈ জামায়াত এমপির ভিডিও নিয়ে মুখ খুললেন সেই তরুণী ও তার বাবা (ভিডিও) ◈ সিঙ্গাপুর-মালদ্বীপের সমান বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠছে নতুন ভূখণ্ড, আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটার!(ভিডিও) ◈ দ্বৈত নাগরিক ও আইসিটিতে অভিযুক্তরা প্রার্থী হতে পারবেন না, আ.লীগ নেতাদের প্রার্থিতা ঠেকানোর সুযোগ নেই: ইসি ◈ কেউ পারফর্ম করতে না পারলে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনবেন প্রধানমন্ত্রী: তথ্য উপদেষ্টা ◈ পলায়নকালে ইমিগ্রেশন আইন ভঙ্গ: হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন ◈ চাপের মুখে মোদি সরকার: ককরোচ পার্টির আন্দোলনের মধ্যেই রাস্তায় নেমেছেন কৃষকরা

প্রকাশিত : ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৯:০৮ সকাল
আপডেট : ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৪৩ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চীনে জ্বালানির দাম ১২% বৃদ্ধি, বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে দেখা দেওয়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বিঘ্নিত হওয়া, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল থাকা এবং চীনের জ্বালানি নীতির পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে চীন তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এতে দেশটির মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে জড়িত সারা বিশ্বের বাণিজ্যে বিভিন্নমুখী চাপ তৈরিরও আশঙ্কা রয়েছে, যা থেকে বিশ্বে দেখা দিতে পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা পরিবহন ব্যয়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তুলবে।

এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিবর্তে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে বাধ্য হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও ভোগব্যয়কে আরও সংকুচিত করবে, আর এই পরিস্থিতিই টেনে আনতে পারে মন্দা।

সোমবার (২০ জুলাই) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত জ্বালানি) দাম ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে পৌঁছেছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের সময় তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠলেও গত জুনে তা ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল। তবে জুলাইয়ের শুরুতে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

অস্থিরতায় চীনের পদক্ষেপ

বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (এনডিআরসি) জানিয়েছে, ১৮ জুলাই থেকে প্রতি টন পেট্রলের দাম ৩০০ ইউয়ান (প্রায় ৪৪ ডলার) এবং ডিজেলের দাম ২৯০ ইউয়ান বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির মূল্য গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বরাতে জ্বালানি বিশ্লেষক লিউ বিংজুয়ান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্বাভাবিক উত্থান দেখা যাচ্ছে, যা সর্বশেষ মূল্য নির্ধারণ চক্রকে প্রভাবিত করেছে। একই সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির এই অবস্থায় গণমাধ্যমের খবর, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে।ইউরোনিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। করোনাভাইরাস মহামারির পর এত নিম্ন প্রবৃদ্ধি কখনোই ছিল চীনের।

সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও কম এবং জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক নিচে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের সম্প্রসারণ এবং চীনা বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) প্রতি বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি মন্থর হয়েছে।

আইএনজি ব্যাংকের গ্রেটার চায়নার প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং এক নোটে বলেন, ‘২০২২ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে কোভিডজনিত লকডাউনের প্রভাবের পর এটাই কোনো প্রান্তিকে সবচেয়ে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি।’

তেলের মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে সামলাচ্ছে চীন

চীনের হাতে বিশাল কৌশলগত তেল মজুত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক বিস্তার এবং বিশ্বের বৃহত্তম উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক থাকায় দেশটি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় কম তেল আমদানি করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীন এখন কার্যত তেলের দামের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীন কখন এবং কত পরিমাণ তেল আমদানি করবে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে বৈশ্বিক তেলের মূল্য।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার ফলে কিছুদিন সংঘাত বন্ধ ছিল। গত ৭ জুলাই আবার ইরানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ১৭ জুন থেকে ৩০ জুনের মধ্যে ইরান প্রায় ৭ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল চীনে রপ্তানি করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সুযোগে প্রায় ২০টি ট্যাংকার মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় রুট ব্যবহার করে চীনের বিভিন্ন বন্দরে এই তেল পৌঁছে দেয়।

চীনের উৎপাদন ব্যহত হলে বিশ্বে ভয়াবহ সংকট

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ৭১ ট্রিলিয়ন (বা ৫,৭১০ বিলিয়ন) ইউএস ডলার। বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য রপ্তানিকারক এই দেশটির বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৩ দশমিক ৫৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মূলত টেলিকম সরঞ্জাম, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক্স এবং গাড়ি বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যের দেশ হিসেবে চীনের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, জাপান, ভিয়েতনাম এবং জার্মানি।

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানিতে বিশ্বের শীর্ষ বা ১ম স্থানে রয়েছে চীন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) তথ্যমতে, একক দেশ হিসেবে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩২ শতাংশের বেশি চীনের দখলে রয়েছে। 

সস্তা শ্রম ও উন্নত অবকাঠামোর কারণে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রবিন্দু এখন চীন। বৈশ্বিক জিডিপির চালিকাশক্তি চীন গত প্রায় ১৫ বছর ধরে বৈশ্বিক জিডিপিতে দেশটি প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রেখে আসছে।

চীনের সাম্প্রতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি দেশটির শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এতে দেশটির সঙ্গে সারা বিশ্বের বাণিজ্য ভারসাম্য নষ্ট হওয়ারও প্রবল আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

চাপ সৃষ্টি করবে বাংলাদেশেও

পাশাপাশি, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশেও চীন তার প্রভাব বজায় রেখেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশেও চীন থেকে ব্যাপক পরিমাণ পণ্য (প্রধানত শিল্পের কাঁচামাল, ভারী যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স) আমদানি করে। চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ১ হাজার ৮৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের চীনে রপ্তানির পরিমাণ ১০০ কোটি ডলারও ছাড়ায়নি।

চীনে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। এর আগের বার আমাদের জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ পড়ে। তাছাড়া সামগ্রিকভাবে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে ডলারের সরবরাহ ও দাম ওঠানামার বিষয়টি জড়িত। ডলারের দাম বাড়লে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হবে।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বাংলানিউজকে বলেন, জ্বালানিকে বলা হয় বিশ্ব অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ। জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সমগ্র পৃথিবীতেই পড়ে। কারণ এর সঙ্গে উৎপাদন ও এর ব্যয় জড়িত। জ্বালানির দামে বর্তমানে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করেছে। 

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বেশি মজুত রয়েছে জাপানে। অন্যান্য অনেক দেশেরই জ্বালানির মজুত সেরকম নেই। ফলে সেই সব দেশ তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়তে পারে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এই সংকট নিরসনে সরকারকে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি সহনশীল মাত্রায় রাখতে চেষ্টা করতে হবে।’ তার মতে, জ্বালানি তেলের বড় অভিঘাত নেমে আসে মূল্যস্ফীতির ওপর। 

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেও জ্বালানির বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি সীমিত করায় আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 

জ্বালানি মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্যাট্রিক ডি হান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় মূল্য আবারও গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং ডিজেলের গড় মূল্য ৫ ডলার স্পর্শ করেছে। তার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মার্কিন নাগরিকরা প্রতিদিন গ্যাসোলিন কিনতে অতিরিক্ত ৩০৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছেন।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। যদি হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘায়িত হয়, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমে যায় এবং জ্বালানির মূল্য ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে, তাহলে আগামী কয়েক প্রান্তিকের মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে মন্দার মুখোমুখি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের দৃষ্টি এখন মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে—হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয়, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ কী দাঁড়ায় এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন আবার কবে বড় পরিসরে তেল কেনা শুরু করে। এই তিন প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতির আগামী পথচলা।

পিটিইআরসির চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, ‘অর্থনীতিতে যখন কর্মসংস্থান কমে যায় এবং একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় তখন তাকে মন্দা বলা হয়। আমরা আশঙ্কা করছি, মধ্যপ্রাচ্যের এর সংকট দীর্ঘায়িত হলে তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সরকার যখন সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি বাড়াতে থাকবে তখন কর্মসংস্থান সৃষ্টির খাতগুলোতে বরাদ্দ কমে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্লথ করে দেবে।’

এতে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতেই মন্দাভাব দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন পিটিইআরসির চেয়ারম্যান।

৪৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত

এদিকে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম ইউরেশিয়া ডেইলির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির বরাতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটির বর্তমান কৌশলগত তেলের মজুত কমে মাত্র ৩১৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৩ সালের পর এটিই আমেরিকার ইতিহাসের সর্বনিম্ন মজুত। এমনকি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদের সর্বনিম্ন রেকর্ডের চেয়েও এটি ২৭ মিলিয়ন ব্যারেল কম।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এবার মূলত ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও জ্বালানিগত প্রভাব মোকাবিলার অংশ হিসেবে এই মজুত ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলোর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

রাশিয়ার ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইগর ইউশকভ এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একই নীতি অনুসরণ করছে এবং মজুত থেকে তেল উত্তোলন করছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রয়েছে। তবে প্রতিবার যখনই দেশটির তেলের মজুত রেকর্ড মাত্রায় কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ পায়, তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম এশিয়ার তেল বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছানোর বিকল্প পথ ও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে।

পার্সটুডেকে দেওয়া এক বক্তবে ইউশকভ সতর্ক করে বলেন, চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েলের দাম আবারও ১০০ ডলার বা তারও বেশি ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সূত্র: বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়