মনিরুল ইসলাম: বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে নতুন করে অন্তত ১২টি রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এসব নির্মাণকাজ শুরু হয়। অথচ পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত এই দ্বীপে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দ্বীপটিতে নতুন করে ৭০টির বেশি রিসোর্ট গড়ে ওঠে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা ও উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার হলে নির্মাণ অনেকটাই থেমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও গোপনে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পর্যটন মৌসুম শেষে যখন টেকনাফের সঙ্গে নৌ যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকে, তখনই বাড়ে নির্মাণ তৎপরতা। কেয়াবন ও নারকেলগাছ কেটে নতুন স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। সৈকত থেকে বালু ও চুনাপাথর তুলে নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশবিদদের মতে, দুই বছর আগে পর্যটক সংখ্যা সীমিত করার ফলে দ্বীপের প্রকৃতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণ সেই অগ্রগতিকে আবারও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর হিসাবে, গত তিন দশকে সেন্ট মার্টিনে ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্মাণসহ এই সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় কেয়াবন সৃজন, প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং সামুদ্রিক কাছিম সংরক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে অবৈধ নির্মাণ অব্যাহত থাকলে এই প্রকল্পের সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “অপরিকল্পিত হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশির ভাগ নতুন রিসোর্টের মালিক বাইরের জেলার প্রভাবশালী ব্যক্তি। নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে বিধিনিষেধ থাকলেও নানা কৌশলে ইট, বালু, রড ও সিমেন্ট দ্বীপে আনা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আনা উপকরণের একটি অংশ রিসোর্ট নির্মাণে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল সেন্ট মার্টিনকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এরপরও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ না হলে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তথ্য সূত্র : প্রথম আলো