বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। নদী শুধু এ দেশের ভূপ্রকৃতির অংশ নয়—কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, শিল্প, জীববৈচিত্র্য এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক সরাসরি। অথচ অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, নগর পয়ঃবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্যের চাপে দেশের বহু নদী আজ দূষণের ভারে বিপর্যস্ত। সরকারের নদী ও পানি-মানসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রধান নগর ও শিল্পাঞ্চলের আশপাশের নদীগুলোর পানির মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি জাতীয় পর্যায়ের পানি-মান মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বড় শহর ও নগরকেন্দ্রের আশপাশের নদীগুলোতে পৌর ও শিল্প কঠিন বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য নদীদূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) রিভার পল্যুশন মনিটরিং সিস্টেম সংক্রান্ত তথ্যেও দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে নদীদূষণের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালের একটি জরিপে শিল্প, পৌর ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে ৫৬টি নদী মারাত্মকভাবে দূষিত হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ঢাকার নদীগুলো সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ
নদীদূষণের সংকট ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে সবচেয়ে স্পষ্ট। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার মতো নদী দীর্ঘদিন ধরে শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, কঠিন বর্জ্য ও নগর দূষণের চাপ বহন করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পানি-মান মূল্যায়নে ২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদীর পানিতে উচ্চমাত্রার বিওডি, সিওডি ও ঘোলাভাবের তথ্য পাওয়া যায়। বুড়িগঙ্গায় ২০২২ সালের বিভিন্ন সময়ে বিওডি ও সিওডির উচ্চমাত্রা এবং বালু ও তুরাগ নদীতেও দূষণের উচ্চমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি বর্ষাকালের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে বেশি অবনতিশীল; নদীর প্রবাহ বাড়লে পানির মানও তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়। এখানে বিওডি বা বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড পানিতে জৈব পদার্থ ভাঙতে অণুজীবের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমাণ নির্দেশ করে। বিওডি বেশি হলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
শুধু শিল্পবর্জ্য নয়, পয়ঃবর্জ্যও বড় সংকট
নদীদূষণ নিয়ে আলোচনা হলে শিল্পকারখানার বর্জ্যের কথা সামনে আসে। কিন্তু নগর পয়ঃবর্জ্যের সমস্যাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং আরও প্রায় ২ শতাংশ কার্যকর ফিকাল স্লাজ ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করে। ফলে ঢাকার ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও স্যুয়ারেজ আন্তঃসংযুক্ত জলপথে গিয়ে পড়ে। এটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য নদী ও জলাশয়ে প্রবেশ করলে পানির জৈব দূষণ বাড়ে এবং রোগজীবাণু ও অন্যান্য দূষকের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শিল্পায়নের মূল্য কি নদী দেবে?
ঢাকার আশপাশে শিল্পের ঘনত্ব নদীদূষণের সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ও এর আশপাশে ৭ হাজারের বেশি কারখানা প্রতিদিন আনুমানিক ২.৪ বিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি জলপথে ছাড়ে—বিশ্বব্যাংক এই শিল্পদূষণকে ঢাকার পানিদূষণের একটি তীব্র সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু শিল্পকারখানাকে দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নগর ড্রেনেজ এবং নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলার প্রবণতাও একই সংকটের অংশ। অর্থাৎ নদীদূষণ মূলত একাধিক উৎসের সম্মিলিত ফল।
বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা থাকলেও প্রশ্ন বাস্তবায়নে
শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা ইটিপি এবং নগর পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কিন্তু শুধু স্থাপনা থাকলেই নদী দূষণমুক্ত হবে না; সেগুলো নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ঢাকা পানিদূষণ মোকাবিলা কর্মসূচিতে শিল্পবর্জ্য শোধন, পানির পুনঃব্যবহার, বাস্তবসম্মত দূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটির আওতায় ঢাকার চারটি প্রধান নদীকে কেন্দ্র করে সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট—নদীদূষণ মোকাবিলায় এখন শুধু অভিযান বা জরিমানার ওপর নির্ভর না করে দূষণের উৎস শনাক্তকরণ, বর্জ্য শোধন, নিয়মিত মনিটরিং এবং জবাবদিহি—এই চারটি বিষয়কে একই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
নদীর পানি দূষিত হলে তার প্রভাব নদীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়ে এবং দূষিত পানি বিভিন্নভাবে মানুষের সংস্পর্শে এলে জনস্বাস্থ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জাতীয় পানি-মান মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, দেশের পৃষ্ঠজলের দূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পয়ঃবর্জ্য, কঠিন বর্জ্য এবং শিল্পবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যজাত তরল নিঃসরণ। নগর এলাকায় শিল্পদূষণকে পৃষ্ঠজল দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে নদী রক্ষার প্রশ্নটি শুধু পরিবেশবাদীদের দাবি নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও।
তাহলে করণীয় কী?
নদীদূষণ কমাতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দূষণের উৎস বন্ধ করা। নদীতে গিয়ে দূষিত পানি পরিষ্কার করার চেয়ে নদীতে দূষিত পানি প্রবেশ ঠেকানো অনেক বেশি কার্যকর। তাই—
পঞ্চমত, পরিবেশ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একদিনের অভিযান নয়; প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি ও দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর ব্যবস্থা।
ষষ্ঠত, নদী রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
নদী বাঁচানোর সিদ্ধান্ত এখনই
বাংলাদেশের নদীগুলোকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা অসম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য নদীতে বর্জ্য ফেলার পর পরিষ্কার করার পুরোনো পদ্ধতি থেকে সরে এসে উৎসস্থলেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে ঢাকা অঞ্চলের পানি দূষণ কমাতে বড় আকারের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের কর্মসূচিতে স্যানিটেশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ এবং নদী পুনরুদ্ধারকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বা কর্মসূচি তখনই সফল হবে, যখন তার বাস্তবায়ন হবে স্বচ্ছ, নিয়মিত এবং জবাবদিহিমূলক। নদীকে বাঁচাতে তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—অপরিশোধিত বর্জ্যেই কি মরছে বাংলাদেশের নদী? উত্তরটি শুধু নদীর পানির রঙে বা দুর্গন্ধে নয়; সরকারি পানি-মান তথ্য, দূষণের উৎস এবং নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্রেও পাওয়া যায়। এখন প্রয়োজন সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে দূষণের উৎস বন্ধ করা। কারণ নদীকে বর্জ্যের শেষ ঠিকানা বানিয়ে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। ---জাগোনিউস ২৪
মোয়াজ্জেম হোসেন টিপু
লেখক: পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মী।