প্রশান্ত মহাসাগরে দানা বাঁধতে থাকা এল নিনো জলবায়ু পরিস্থিতি স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নিতে যাচ্ছে। এমনই পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস (মেট অফিস)। প্রাকৃতিক জলবায়ুর এই শক্তিশালী প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে বলে সতর্ক করেছে মেট অফিস। ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন সৃষ্টির তীব্রতা কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের শরৎকাল তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিবহুল ও ঝড়ো হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ বলেন, আমাদের স্পষ্ট বোঝা উচিত এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
এল নিনো কী?
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয় এবং সাধারণত প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়। এই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হওয়া বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা গতিপথ বদলে ফেলে, যার ফলে গরম পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে গেলে বিজ্ঞানীরা এল নিনো ঘোষণা করেন। বর্তমানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ওপরে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় প্রভাব
সমুদ্রে তাপের এই অসম বণ্টন এবং বায়ুমণ্ডলে বাতাসের প্রবাহের পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। সব এল নিনো একই রকম হয় না এবং এর প্রভাবও ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আলাদা হয়। তবে ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টিপাত ২০২৬ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম রেকর্ড করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ায় প্রভাব
চলতি গ্রীষ্মে বিশ্বজুড়ে যে রেকর্ডভাঙা তাপদাহ দেখা গেছে, তার জন্য এল নিনোকে সরাসরি দায়ী করা না হলেও শরৎকাল ও শীতের শুরুতে এর বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে যুক্তরাজ্যসহ উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো আবহাওয়া তৈরি হতে পারে।
২০২৭ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার আশঙ্কা
এল নিনো চলাকালীন সমুদ্র থেকে প্রচুর পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়। মেট অফিসের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোন জানান, এতে বিশ্বজুড়ে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে এল নিনোর শীতকালীন চূড়ার পরবর্তী ক্যালেন্ডার বছরে। ফলে ২০২৭ সাল ২০২৪ সালের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছিল যে, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য সংকটে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ ভয়াবহ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে পারে।
সূত্র : বিবিসি।