মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন নাটোরের শিক্ষার্থী রমজান মাহমুদ। ২১ দিন পর তার কাছে দাবি করা হয় দ্বিগুণ টাকা। ৫ হাজার টাকা দিয়েও রেহাই মেলেনি; অ্যাপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা ফোন নম্বর ব্যবহার করে কল করা হয় তার বাবা ও মামাকে। শেষ পর্যন্ত বাবার কাছ থেকেও আদায় করা হয় আরো ৫ হাজার টাকা। জরুরি প্রয়োজনে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে নেয়া ছোট্ট একটি ঋণ এভাবেই রমজানের জন্য পরিণত হয় হয়রানি ও অর্থ আদায়ের ফাঁদে।
রমজান একা নন। দ্রুত ঋণ, কম সুদ ও জামানত ছাড়াই টাকা দেয়ার চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অননুমোদিত লোন অ্যাপের ফাঁদে পড়ছেন অনেকেই। ঋণের নামে সংগ্রহ করা হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, ছবি ও ফোনে সংরক্ষিত নম্বরসহ সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য। পরে সেগুলো ব্যবহার করেই চলছে ভয়ভীতি, সামাজিকভাবে হেয় করার হুমকি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ৩১টি অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপ ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম সম্পর্কে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
রমজান মাহমুদ বণিক বার্তাকে জানান, জরুরি প্রয়োজনে টাকার দরকার হওয়ায় বেশি কিছু না ভেবেই একটি লোন অ্যাপ থেকে ঋণ নেন তিনি। অল্প সময় ও খুব সহজেই তিনি টাকাও পেয়ে যান। তবে সমস্যার শুরু হয় ২১ দিন পর, যখন ঋণের টাকা পরিশোধ করতে যান। রমজান বলেন, ‘৩৫০০ টাকা ঋণ নেয়ার ২১ দিন পর অ্যাপ কর্তৃপক্ষ ৭ হাজার টাকা দাবি করে। ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার পর বাকি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা চাপ সৃষ্টি শুরু করে। এক পর্যায়ে অ্যাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ফোনে সংরক্ষিত মামা ও বাবার নম্বরে কল করে অভিযোগ করে। পরে আমার বাবার কাছ থেকেও তারা আরো ৫ হাজার টাকা নেয়।’
অন্যদিকে রাজধানীর সায়েদাবাদের ফারহানা রহমান ৫ লাখ টাকা ঋণের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন। ফাইল খোলার কথা বলে তার কাছ থেকে অগ্রিম ৯০ হাজার টাকা নেয় প্রতারকরা। এরপর তারা সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
অনলাইনে ঋণের নামে এমন প্রতারণার অভিযোগ এখন অহরহ উঠছে। কোথাও ঋণ দেয়ার পর অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে হয়রানি করা হচ্ছে, আবার কোথাও ঋণ দেয়ার আগেই ফি নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে প্রতারকরা। এমন পরিস্থিতিতে ৩১টি অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপ ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম সম্পর্কে সতর্ক করেছে বিএফআইইউ। গতকাল এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, অনুমোদন ছাড়া অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা বৈধ নয়। এ ধরনের প্লাটফর্ম সাধারণত মানুষের আর্থিক প্রয়োজনকে লক্ষ্য করে প্রচার চালায়। অল্প সময়ে ঋণ, কম সুদ, জামানত ছাড়াই টাকা কিংবা সহজ কাগজপত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হয়।
এরপর ঋণের আবেদন সম্পন্ন করার জন্য নানা ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় অ্যাপের বিভিন্ন পারমিশন দেয়ার ক্ষেত্রে। কোনো কোনো অ্যাপ ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট, গ্যালারি, ছবি বা অন্যান্য তথ্য ব্যবহারের অনুমতি চায়। ব্যবহারকারী এসব অনুমতি দিলে পরবর্তী সময়ে ওই তথ্য ব্যবহার করে তাকে হয়রানি বা চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে।
শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নেয়াই নয়, ঋণ দেয়ার আগে প্রসেসিং ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি বা অন্য কোনো অগ্রিম অর্থ চেয়েও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ দেয়ার পর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য চাপ এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ভয় দেখানোর অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
বিএফআইইউর নজরে থাকা অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও টাকানাও। প্লে স্টোরে অ্যাপগুলোর বিপুলসংখ্যক ডাউনলোডের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. ফাহিমা তাবাসসুম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনোভাবেই নিজের ফোনের অ্যাকসেস অপরিচিত কোনো অ্যাপ বা প্লাটফর্মকে দেয়া উচিত নয়। কেউ প্রতারিত হলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’ এ ক্ষেত্রে সাইবার আইন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাই সাইবার আইনে বিষয়টা পরিষ্কার করার তাগিদ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রতারকরা সুযোগ পাওয়ার বড় একটি কারণ হলো পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট।
তাই পুলিশকে সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার প্রবণতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার জোরদার করা এবং গ্রামগঞ্জের মানুষের মধ্যে লিফলেট বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
বিদ্যমান আইনে এসব নতুন ধরনের প্রতারণার বিচার করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপণ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে এসব নতুন ধরনের প্রতারণার বিচার করা সম্ভব নয়। আইনে অপরাধের ধরন ও তার শাস্তির বিষয়গুলো নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হয়।
যেহেতু এ ধরনের অপরাধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই, তাই বিদ্যমান আইনে এসব অপরাধের বিচার করার সুযোগ সীমিত। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, এর সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। তাই সাইবার আইনকে শুধু প্রযুক্তিকেন্দ্রিক না করে আইনজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট জায়গা বা কাঠামো রাখা প্রয়োজন, যাতে নতুন ধরনের সমস্যাগুলোরও আইনি সমাধান করা যায়।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো লোন অ্যাপ ব্যবহারের আগে শুধু ঋণের পরিমাণ, সুদের হার কিংবা দ্রুত টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেখলে চলবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত কিনা, ঋণের বিপরীতে সুদসহ মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং প্রসেসিং বা নিবন্ধন ফির নামে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে অ্যাপটি জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ব্যক্তিগত ছবিসহ কী ধরনের তথ্য চাইছে এবং ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট বা গ্যালারিতে প্রবেশের অনুমতি কেন প্রয়োজন সেটিও সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য বা অনুমতি চাইলে ওই অ্যাপ ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘অননুমোদিত কোনো অ্যাপ বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনে না জড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করার আগে গ্রাহকদের আরো সচেতন হতে হবে।
অননুমোদিত ডিজিটাল ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণা, অবৈধ লেনদেন, অর্থ পাচার এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের মতো বিষয় জড়িত থাকতে পারে। সেজন্য কোনো ঋণ নেয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিনা, তা যাচাই করার জন্য আমরা গ্রাহকদের অনুরোধ জানিয়েছি।’ সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন