মনিরুল ইসলাম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি চিত্রনায়িকা পরীমনির একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনায় নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী পরীমনি। তাঁর প্রশ্ন, এত বড় ও ক্ষমতাধর একটি গণমাধ্যমের পক্ষে নোটিশ পাওয়ার পরও এক ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওটি সরিয়ে ফেলা কি সম্ভব ছিল না?
সম্প্রতি মাছরাঙা টেলিভিশনের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি পরীমনির একটি আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশিত হয়। ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিনেত্রী। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক পেজে লাইভে এসে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
‘শুধু সরি বললেই দায় শেষ হয় না’
লাইভে পরীমনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করলেই ঘটনার দায় শেষ হয়ে যায় না। তাঁর মতে, বিষয়টি কেবল ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনা একজন মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান, সামাজিক অবস্থান ও মানসিক স্বস্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পরীমনির বক্তব্যে উঠে আসে, একটি পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো ভিডিও প্রকাশিত হলে সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলাদা প্রত্যাশা তৈরি হয়। ফলে সেখান থেকে প্রকাশিত কোনো আপত্তিকর বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
নোটিশের পরও এক ঘণ্টায় ভিডিও সরানো যায়নি কেন?
পরীমনির বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভিডিওটি সরিয়ে ফেলার সময় নিয়ে তাঁর প্রশ্ন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এত বড় ও প্রভাবশালী একটি গণমাধ্যমের কাছে নোটিশ যাওয়ার পরও এক ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওটি নামিয়ে ফেলা সম্ভব ছিল না কেন—এ প্রশ্নের জবাব থাকা প্রয়োজন।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়া নয়; বরং প্রকাশের পর সেটি সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও। বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি কোনো আপত্তিকর ভিডিও একজন পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ও ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই এমন কনটেন্ট শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভিডিওটি সরানোর জন্য ঠিক কখন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, নোটিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং ভিডিওটি কতক্ষণ অনলাইনে ছিল—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুরোনো ভিডিও, নতুন করে বিতর্ক
প্রকাশিত সংবাদে পরীমনির বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, ভিডিওটি নতুন নয়। প্রায় এক থেকে দেড় বছর আগেও অনেকে তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিওটি পাঠিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। কিন্তু সম্প্রতি একটি পরিচিত গণমাধ্যমের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে সেটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এ ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—কোনো ভিডিও আগে থেকেই অনলাইনে ছড়িয়ে থাকলেও সেটি নতুন কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা বা পুনরায় প্রচার করা ঝুঁকিমুক্ত নয়। বরং পরিচিত গণমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত হলে ভিডিওটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ভিডিও বাস্তব ভিডিওর মতো মনে হতে পারে। ফলে দর্শকেরা বিভ্রান্ত হতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই কোনো ভিডিও প্রকাশের আগে তার সত্যতা ও উৎস যাচাই করা জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরির ঝুঁকিও বেড়েছে। এ ধরনের ভিডিওতে কারও মুখ বা পরিচিতি ব্যবহার করে এমন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব, যা বাস্তবে ঘটেনি।
এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত মর্যাদা, পেশাগত ভাবমূর্তি ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরবর্তী সময়ে সেটি সরিয়ে ফেললেও ইতিমধ্যে ডাউনলোড করা বা অন্যত্র শেয়ার করা কপি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরীমনিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ক্ষোভের বিষয় নয়; এটি এআই-নির্মিত কনটেন্টের সত্যতা যাচাই, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং ব্যক্তির সম্মান সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এ ধরনের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির উদ্বেগের সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপও প্রয়োজন। ভিডিওটি কীভাবে প্রকাশিত হলো, প্রকাশের আগে যথাযথ যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং অভিযোগ ওঠার পর কত দ্রুত সেটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি কমতে পারে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি। কোনো ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে সেটি শেয়ার করা, লিংক ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কটূক্তি করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পরীমনির বক্তব্যে স্পষ্ট, এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঘটনাকে তিনি সাধারণ ভুল হিসেবে দেখছেন না। তাঁর প্রশ্ন, এত বড় একটি গণমাধ্যমের পক্ষে নোটিশ পাওয়ার পরও এক ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওটি সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি কেন?
এই প্রশ্নের জবাবের পাশাপাশি প্রয়োজন ঘটনার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা। কারণ, ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কয়েক মিনিটেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সেই ভিডিওর কারণে কারও সম্মান ও ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়, তা শুধু একটি পোস্ট মুছে ফেলেই সব সময় পূরণ করা সম্ভব নয়।