মনিরুল ইসলাম : ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা দম্পতি ও কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুঞ্জন ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন অভিনেতা ওমর সানী। স্ত্রী ও পরিবারকে নিয়ে মিথ্যা সংবাদ, সম্পাদিত ভিডিও এবং ভিত্তিহীন তথ্য প্রচারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসব অপপ্রচার মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
আজ বুধবার ১৪ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) শিল্পী সমিতির সামনের বাগানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ওমর সানী। এ সময় পরিবারকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন এই অভিনেতা।
মৌসুমীকে নিয়ে কী অপপ্রচার?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজ ও ভিডিওতে দাবি করা হয়, ওমর সানী ও মৌসুমীর ছেলে ফারদিন এহেসান স্বাধীন কৌশলে পরিবারের সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ি থেকে মাকে বের করে দিয়েছেন।
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। তবে অভিযোগটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ওমর সানী।
অভিনেতার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছেলে ফারদিন বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন এবং মৌসুমী রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের কোনো সম্পত্তি নেই বলেও দাবি করেন তিনি। ফলে মৌসুমীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার খবরের কোনো ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন এই অভিনেতা।
ওমর সানীর বক্তব্য, বাস্তবতার সঙ্গে মিল না রেখে এ ধরনের তথ্য প্রচার করে তাঁর পরিবারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হচ্ছে।
‘চলচ্চিত্রে এসে কি আমরা পাপ করেছি?’
সংবাদ সম্মেলনে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওমর সানী।
তিনি বলেন, ‘আমার বউ আমার টেনশন না, আপনাদের টেনশন। আমার ছেলে কিছুক্ষণ আগেও এ বিষয়ে কথা বলেছে। সে আইনের আশ্রয় নিতে বলেছে। আমাদের নিয়ে লেখালেখি না করলেই নয়?’
পরিবার নিয়ে ভালো আছেন জানিয়ে অভিনেতা বলেন, ‘ভাই, আমরা অনেক সিনিয়র হয়ে গেছি। চলচ্চিত্রে এসে কি আমরা পাপ করেছি? আমি আমার পরিবার নিয়ে অনেক ভালো আছি। নিজের কাজ নিয়েও ভালো আছি। আমি চুরি করি না। আমরা এখনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে চাই।’
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অযাচিত আলোচনা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে তিনি বিরক্ত। চলচ্চিত্রে অভিনয় করার কারণে তাঁদের পরিবারকে নিয়ে এভাবে চর্চা করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম, আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
পরিবারকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ওমর সানী বলেন, ‘আমার বেশি টাকা লাগে না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। চলে যাওয়ার সময় এসে গেছে। আমাদের নিয়ে মিথ্যা কথা ছড়াবেন না। যেসব পোস্টে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে না নিলে মামলা করব।’
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, অন্য কেউ দেশের বাইরে থাকেন এবং এখন পরিবারের জন্য কিছু করার সময়—এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের নিয়ে এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কী অর্জন করছেন।
অভিনেতার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জনের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তিনি। বরং মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধ না হলে আইনি পথেও এগোতে প্রস্তুত।
তবে সংবাদ সম্মেলনে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পেজগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মায়ের সম্মান রক্ষায় সরব ছেলে ফারদিন
মৌসুমীকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে আগেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন ওমর সানী ও মৌসুমীর ছেলে ফারদিন এহেসান স্বাধীন।
বুধবার নিজের ফেসবুক পোস্টে সংশ্লিষ্ট পেজগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতর্কিত কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা দেন তিনি। অন্যথায় উকিল নোটিশ পাঠানো এবং মামলা করার হুঁশিয়ারি দেন।
ফারদিনের পোস্টে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে প্রচারিত কনটেন্টের স্ক্রিনশটও ছিল। তাঁর অভিযোগ, কয়েকটি ফেসবুক পেজে তাঁদের পরিবারকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছিল।
মাকে নিয়ে এমন প্রচারণার প্রতিবাদ জানিয়ে ফারদিন লেখেন, ‘আমার মা হচ্ছে আমার মাথার তাজ।’
ছেলের এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ওমর সানী। ফারদিনের পোস্টটি নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে শেয়ার করে তাঁকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
ফলে বিষয়টি নিয়ে বাবা ও ছেলের অবস্থান একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে—পরিবারকে নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার বন্ধ করতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
হলুদ সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার
ওমর সানী ও মৌসুমীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি আবারও বিনোদন অঙ্গনে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অতিরঞ্জিত সংবাদ, বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি সামনে এনেছে।
সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। তবে সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে যাচাই না করা তথ্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সম্মানহানি ঘটতে পারে। বিশেষ করে সম্পাদিত ভিডিও, পুরোনো বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ কিংবা মনগড়া বর্ণনা দিয়ে তৈরি কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া। কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে তার সত্যতা যাচাই করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য তুলে ধরা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখেই তা সত্য বলে ধরে নেওয়া বা যাচাই ছাড়াই শেয়ার করা উচিত নয়। কারণ, একটি মিথ্যা তথ্য বা সম্পাদিত ভিডিও শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, তাঁর পুরো পরিবারকেও মানসিক চাপ ও সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে পারে।
ওমর সানীর প্রতিবাদ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। তাঁর অভিযোগ, পরিবারকে নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কাজের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুঞ্জন, নতুন নয়
এর আগেও ওমর সানী ও মৌসুমীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে প্রকাশিত খবরের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বক্তব্যের সম্পাদিত অংশ প্রচারের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন ওমর সানী।
আগের এক বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর ও মৌসুমীর বক্তব্যের কিছু অংশ কেটে বাদ দিয়ে কিংবা নিজেদের মতো করে সংলাপ তৈরি করে প্রচার করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডকে বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে তিনি এমন প্রচারণা বন্ধের আহ্বান জানান।
এবারও স্ত্রী ও ছেলেকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করলেন এই অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, পরিবার নিয়ে তাঁরা ভালো আছেন এবং নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চান।
নজর এখন সংশ্লিষ্ট পেজগুলোর দিকে
ওমর সানী ও তাঁর ছেলে ফারদিন—দুজনই সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলোকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতর্কিত কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যথায় আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।