মনজুর এ আজিজ: শিগগিরই মার্চেন্ট বিদ্যুতের দর ঘোষণার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ইউনিট প্রতি দাম ৬ থেকে ৭ টাকার মতো হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রস্তাবিত ৮.৩৯ টাকার বিপরীতে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি সুপারিশ দেয় ৬.৪৮ টাকা। তবে ওই প্রস্তাবকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে দাবি করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ডলারের মূল্যহার ১২৩ টাকা বিবেচনায় ভারতে সৌরবিদ্যুতের মূল্যহার ৩.৮০ টাকা, পাকিস্তানে ৩.৯০ টাকা। এখানে কোন যুক্তিতেই সৌর বিদ্যুতের দাম দ্বিগুণ হতে পারে না।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, কারিগরি কমিটি ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যেসব খরচ বিবেচনায় ৬.৪৮ টাকা প্রস্তাব করেছে সেখানেই অনেক গলদ রয়েছে। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ১.২০ টাকা ধরা হয়েছে। এর ভিত্তি ধরা হয়েছে আইপিপির (বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র) চুক্তি বিবেচনায়। ওই চুক্তিগুলো ছিল বিশেষ বিধান আইনে দরপত্র ছাড়া, যা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সেটি কোনভাবেই উদাহরণ হতে পারে না।
ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানির ৭৫ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রয়েছে। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৭৯ পয়সা ধরা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১২৫ একর জমির মূল্য ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। যা মোট বিনিয়োগের ৯.৫৮ শতাংশ। বাজার মূল্যের চেয়ে এই ব্যয় অনেক বেশি। এর বাইরে আরও কিছু অসংগতি রয়েছে। বাড়তি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাদ দিলে কোনভাবেই ৬ টাকার উপরে দাম হওয়া উচিত না।
জমির বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে। তারা বলেছেন, পনের-বিশ বছর পর ওই জমির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। যা তাদের মালিকানায় থাকবে। সেই জমির বাড়তি দাম অবচয় হিসেবে তুলে দেওয়া যৌক্তিক হতে পারে না।
গণশুনানিতে কোম্পানিভিত্তিক বিতরণ চার্জ ভিন্ন রকম প্রস্তাব করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ণ বোর্ডের ৭০ পয়সা, অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ১ টাকা ৪৩ পয়সা প্রস্তাব করা হয়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, এতো ব্যবধান থাকলে মার্চেন্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকরা প্রথমে আমাদের গ্রাহক টার্গেড করবে। কারণ এখানে বিক্রি করলে ইউনিট প্রতি ৭৩ পয়সা লাভ হবে। ৫০ মেগাওয়াট একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘণ্টায় ৫০ হাজার ইউনিট উৎপাদন করবে। এই বৈষম্য রাখা উচিত হবে না।
ওই বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, গণশুনানির পর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত মতামত পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে, নিশ্চয় সবকিছু বিবেচনা করেই দর ঘোষণা করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব দর ঘোষণা করতে। আশা করছি আগামী সপ্তাহে ঘোষণা দিতে পারবো।
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের ধারণাটি বাংলাদেশে পুরোপুরি নতুন। যা মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে টার্গেট করে করা হয়েছে। এখানে উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে সেখান থেকে শিল্প গ্রাহকের কাছে নিজেরা বিক্রি করতে পারবেন। এ জন্য বিদ্যুতের বিদ্যমান বিতরণ ও সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করতে পারবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র রংপুরে স্থাপিত হলেও ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের কোন গ্রাহককেও সরবরাহ করা যাবে। এ জন্য বিতরণ ও সঞ্চালন চার্জ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে।
সরকারি বিতরণ কোম্পানিগুলো চাইলে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ কিনতে পারবে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। আর সেই বিদ্যুতের দাম সুপারিশ করা হয়েছে ইউনিট প্রতি ৬.৪৮ টাকা। তবে শিল্প মালিকদের কাছে বিক্রির বিষয়টি পুরো ইচ্ছাধীন থাকছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিতরণ কোম্পানিগুলো মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, বৃহৎ ক্রেতারা মার্চেন্ট পাওয়ারে চলে গেলে তারা মারত্মক ক্ষতির শিকার হবেন। কারণ শিল্প গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি। যা আবাসিকে বিক্রি করে তুলে আনা সম্ভব না।
মার্চেন্ট বিদ্যুৎ নিয়ে যখন প্রক্রিয়াধীন তখন বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ইউনিট প্রতি ১০.৫০ টাকায় কেনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একে আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে ক্যাব। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির হাতে। বিদ্যুৎ বিভাগ ওই আদেশ প্রদান করতে পারে না।