শিরোনাম
◈ নেকড়ে হত্যা বৈধতার পথে ট্রাম্প, সিদ্ধান্ত আসতে পারে ৯০ দিনে ◈ বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘোষণা ◈ ‘স্ত্রী মেরেছেন তাই মদ পান’, ভিডিও ভাইরালের পর নারায়ণগঞ্জে নৌ পুলিশের এসআই প্রত্যাহার ◈ স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার-মিছিল নিষিদ্ধ, এআইতেও কড়াকড়ি ইসির ◈ কর ফাঁকি ঠেকাতে আয়-ব্যয়ে গরমিল পেলেই ব্যবস্থা নেবে এনবিআর ◈ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় তারেক রহমান ◈ ভূমি প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল : ৩৬ এসিল্যান্ডকে বদলি ◈ সিন্ধু নদের ওপর বাঁধ দিলো ভারত, পানির স্তর বাড়ল ১০ ফুট ◈ একই দলে খেলবেন মেসি-রোনালদো, পূরণ হচ্ছে ভক্তদের আশা ◈ মানুষের আইকিউ যেভাবে বাড়ানো যায়, কী বলছে গবেষণা

প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১১ রাত
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কৃষিজমি বাঁচিয়ে সৌরবিদ্যুৎ, সম্ভাবনার নতুন মডেল ‘এগ্রিভোলটাইকস’

দেশের জ্বালানি খাত এখন সংকটময় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি, প্রযুক্তির যথাযোগ্য ব্যবহার ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। শিল্প ও কৃষিকে ব্যাহতকারী এবং দৈনন্দিন জীবনে সংকট সৃষ্টিকারী এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা এই সংকটের মূল কারণ; সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ। বিদ্যুৎ সরবরাহে এর নেতিবাচক প্রভাবে শুধু লোডশেডিং নয়; কারখানায় উৎপাদনও কমে যাচ্ছে, সেচকাজে দেখা দিয়েছে ডিজেলের সংকট, কৃষকের ব্যয় ও খাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। 

দেশীয় জ্বালানির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে; নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সফলতা কমছে। কয়লা উত্তোলনের সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বড়। এই প্রতিকূল বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, নবায়নযোগ্য এই জ্বালানি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায়ও সম্ভাবনাময়। কিন্তু ব্যাপক মাত্রায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রধান অন্তরায় বিপুল জমির প্রয়োজনীয়তা। যেহেতু আমাদের জমি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, সৌরবিদ্যুতের জন্য জমি 
পাব কোথায়?

প্রচলিত ভূমি অধিগ্রহণভিত্তিক মডেলে এই সমস্যার সমাধান সহজ নয়। খাদ্য নিরাপত্তা বিবেচনায় কৃষিজমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর আইনগত বিধিনিষেধও রয়েছে। বিপুলসংখ্যক পরিবার এখনও আয়ের একটি অংশের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প হিসেবে খাসজমির প্রস্তাব বেশ প্রচলিত। কাগজে-কলমে বিষয়টি বেশ সহজ মনে হলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। বহু খাসজমি স্থানীয়রা মৌসুমি কৃষিকাজে ব্যবহার করেন; অনেক নিচু জমি বর্ষায় জলাধার হিসেবে কাজ করে। 

একই জমির একাধিক মালিকানার দাবি বা ব্যবহারগত অধিকারও থাকতে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি গবেষণায় বিআইজিডি দেশের ১১টিরও বেশি সৌরপ্রকল্পে কোনো না কোনো ভূমি বিরোধ পেয়েছে। এর মধ্যে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে এবং বর্ষায় জলাশয় হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া জমিও আছে। প্রচলিত সৌরপ্রকল্প স্থাপনে এসব জমি ভরাট করা হলে বর্ষার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত, মৎস্য জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত এবং শীতকালীন ফসল উৎপাদনের সুযোগও হারিয়ে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার ঝুঁকি যখন বাড়ছে, তখন পানিপ্রবাহপথ ও জলাধার রক্ষা আরও জরুরি। একই সঙ্গে কৃষিনির্ভর জীবিকাও রক্ষা করতে হবে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সম্মুখ সারিতে রয়েছে কৃষি খাত। বিআইজিডির আরেকটি গবেষণা দেখিয়েছে, কৃষিজমি অন্য প্রয়োজনে ব্যবহার হলে নারী কৃষিশ্রমিকদের ওপর বিরূপ প্রভাব বেশি পড়ে। ফলে প্রচলিত নকশা ও ভূমি অধিগ্রহণের পদ্ধতিতে বৃহৎ পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা হলে এক সংকট সমাধান করতে গিয়ে নতুন করে ভূমি বিরোধ, জীবিকাহানি, খাদ্য নিরাপত্তার চাপ এবং বন্যা ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় ‘এগ্রিভোলটাইকস’ বা কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ, অর্থাৎ একই জমিতে কৃষি ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত ব্যবস্থা হতে পারে বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান। সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলের উচ্চতা, সারির মধ্যকার দূরত্ব এবং ছায়ার মাত্রা কিছুটা পরিবর্তন করে জমিতে কৃষিকাজ বা ক্ষেত্রবিশেষে মাছ চাষ সম্ভব। এর অর্থ, সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, একই জমির দুটি পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

এই ধারণাকে মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ এবং বিজিইএফ যৌথভাবে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার শোলধারা গ্রামে ৯৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করেছে। সেখানে সৌরপ্যানেলের নিচে ভিন্ন মাত্রার ছায়া তৈরি করে এমন তিন ধরনের নকশা পাশাপাশি পরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি নকশার বিনিয়োগ ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কৃষি থেকে সম্ভাব্য আয় তুলনা করা সম্ভব। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন– উভয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি, যা ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও ফসলের উপযোগী কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ নকশা নির্ধারণে সহায়তা করবে। প্রসঙ্গত, মানিকগঞ্জের প্রকল্পটি স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে নকশা করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের অনেক কৃষিপরিবার বছরে অন্তত একটি ধানের ফসল করতে চান। কারণ ধান সংরক্ষণ ও পরিবহন তুলনামূলক সহজ, স্থানীয় বাজার নিশ্চিত এবং পরিবারের নিজস্ব খাদ্য চাহিদার জোগানদাতা। সে কারণে প্যানেলের নিচে ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোক পৌঁছানো, কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত ফাঁকা স্থান রাখা হয়েছে। প্রচলিত জাতের পাশাপাশি ড. আবেদ চৌধুরী উদ্ভাবিত ছায়া-সহনশীল ধানের জাতও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ধানের বাইরেও চা, ড্রাগন, টমেটো, স্ট্রবেরি, পেঁয়াজ, রসুন, ধনেপাতাসহ শাকজাতীয় ফসলের মতো ছায়া-সহনশীল ফসলের সম্ভাবনা রয়েছে। অতিরিক্ত গরমে প্যানেলের আংশিক ছায়া কিছু ফসলের জন্য উপকারীও হতে পারে।

বর্তমানে মানিকগঞ্জ কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সেচকাজে ও বৈদ্যুতিক গ্রিডে সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসবের উদ্দেশ্য শুধু প্রযুক্তি পরীক্ষা নয়। কোন ধরনের ফসল কোন নকশার সঙ্গে মানানসই, বিদ্যুৎ বিক্রির মডেল কী হবে, কৃষকের সঙ্গে জমি ভাগাভাগির শর্ত কী–এসব প্রশ্নেরও উত্তর তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ফসলের আলোকচাহিদা ও বাজারমূল্য ভিন্ন হওয়ায় অভিন্ন সৌরনকশা সবার জন্য কার্যকর হবে না; বিনিয়োগ ও আয়ের পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

কৃষি-সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাটি হয়তো এখানেই: এটি ভূমি অধিগ্রহণের মডেল থেকে ভূমি ভাগাভাগির মডেলে যাওয়ার সুযোগ দেয়। বৃহৎ সৌরপ্রকল্পে অনেক মালিকের জমি একত্রে অধিগ্রহণ করতে গেলে বিরোধ, মামলা বা দরকষাকষিতে দীর্ঘ সময় চলে যেতে পারে; এতে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি বাড়ে। জমির মূল ব্যবহার অক্ষুণ্ন রেখে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য জমি সমন্বয় করা গেলে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশের কৃষি ব্যবসায় বড় পরিসরে হাজারো কৃষকের সঙ্গে সমন্বয়ের উদাহরণ ইতোমধ্যে রয়েছে। ভূমি ইজারা বা লাভ ভাগাভাগির পরিমাণ নির্ধারণে খোলা জমির তুলনায় ফসলের ফলনে পরিবর্তন এবং কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ কাঠামোর অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রকল্পটি দ্বারা কার্বন ক্রেডিটের সুযোগও অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

এ দেশে সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষির সমন্বয় নিয়ে আলোচনা অনেক সময় সেচব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কৃষি-সৌরবিদ্যুৎকে কেবল সেচের বিদ্যুৎ সরবরাহের পদ্ধতি হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনার বড় অংশই অজানা থেকে যাবে। প্রচলিত সৌরসেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের চাহিদা মূলত সেচ মৌসুমকেন্দ্রিক; অনেক এলাকায় বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে পাম্পের ব্যবহার বেশি থাকে। বছরের অন্য সময়ে উৎপাদনক্ষমতা পুরোপুরি কাজে না লাগায় প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত আয় কঠিন হয়; প্রাথমিক বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারেও দীর্ঘ সময় লাগে। কৃষি-সৌরবিদ্যুতে একই জমিতে কৃষিকাজ বজায় রেখে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রয়োজন অনুযায়ী সেচে ব্যবহার করা যেতে পারে। বছরের অন্যান্য সময়ে গ্রিড, শিল্পকারখানা বা অন্য ক্রেতার কাছেও সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।

কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত আলো ও চলাচলের জায়গা রাখতে প্যানেলগুলোর দূরত্ব বাড়ানোয় একই আয়তনের জমি থেকে প্রচলিত সৌরনকশার তুলনায় কাঠামো ব্যয় বাড়তে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কমতে পারে। এই তুলনা কেবল একরপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা যাবে না। এর বিপরীতে ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও বিরোধের ঝুঁকি, কৃষি উৎপাদন হারানোর ক্ষতি, জলাশয় ও বন্যাপ্রবাহের জায়গা নষ্ট হওয়ার সামাজিক-পরিবেশগত মূল্য, জীবিকার ক্ষতি হিসাব করলে বোঝা যাবে কোন মডেল দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জন্য বেশি লাভজনক।

বর্তমানে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত সম্প্রসারণে আগ্রহী এবং সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন নতুন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় ‘সৌরবিদ্যুৎ নাকি কৃষি’ প্রশ্নের বদলে প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে একই জমি থেকে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ, খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকা সম্ভব। জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের পথে জমি, কৃষি ও মানুষকে যেন মূল্য দিতে না হয়–এই নীতিই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ সৌরপরিকল্পনার ভিত্তি।----সমকাল 

ড. আবেদ চৌধুরী: জিন বিজ্ঞানী; রোহিনী কামাল: সহকারী অধ্যাপক, 
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ