বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে দেশ। দীর্ঘদিনের ১ জুলাই–৩০ জুন অর্থবছরের পরিবর্তে ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ অর্থবছর চালুর সিদ্ধান্ত নতুন করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বাজেট বাস্তবায়ন এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী রূপান্তরকাল শেষে এপ্রিল–মার্চ সময়সূচি কার্যকর হওয়ার কথা। অর্থবছরের এই পরিবর্তনকে কেবল হিসাবের খাতা বদল হিসেবে দেখলে এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক তাৎপর্য যথাযথভাবে অনুধাবন করা যাবে না।

কেন অর্থবছর পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের অর্থনীতি ঋতুভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বর্ষাকাল, কৃষি মৌসুম, নির্মাণকাজ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই আবহাওয়ার প্রভাব সুস্পষ্ট। বর্তমান জুলাই–জুন অর্থবছরের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অর্থবছরের শুরুতেই বর্ষাকাল চলে আসে। ফলে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু করতে বিলম্ব ঘটে। আবার অর্থবছরের শেষদিকে জুন মাসে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর কার্যকর হলে বাজেট ঘোষণার পর বর্ষাকালের আগেই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্ষা-পরবর্তী অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত তুলনামূলক শুষ্ক সময়ে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দীর্ঘ ও অনুকূল সময় পাওয়া সম্ভব। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—শুধু অর্থবছরের তারিখ পরিবর্তন করলেই প্রকল্পের গুণগত মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হবে না। এর জন্য প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, জমি অধিগ্রহণ, অর্থছাড় এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বিত সংস্কারও অপরিহার্য।
উন্নয়ন প্রকল্পে সম্ভাব্য সুফল
নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হতে পারে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের সময় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে অনেক প্রকল্পে ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কখনো কখনো প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার প্রবণতা দেখা দেয়, যা গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর চালু হলে বছরের শেষ তিন মাস—জানুয়ারি থেকে মার্চ—প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন, গুণগত মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য অধিক কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘কত টাকা ব্যয় হলো’ তা নয়, বরং ‘কতটা কার্যকর ও মানসম্মত কাজ সম্পন্ন হলো’। এই পরিবর্তন সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় expenditure-based management থেকে outcome-based management-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা
অর্থবছর পরিবর্তনের আরেকটি সম্ভাব্য সুফল হলো রাজস্ব আহরণকে আরও পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা। বর্তমানে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণ তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়; বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও এপ্রিল–জুন সময়ে রাজস্ব আহরণের চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। এপ্রিল–মার্চ কাঠামোতে রাজস্ব পরিকল্পনা, কর প্রশাসন এবং সরকারি ব্যয়ের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে। তবে এর সুফল নিশ্চিত করতে হলে করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং করদাতাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার মতো কাঠামোগত সংস্কারও অত্যন্ত জরুরি।
ভারতের অভিজ্ঞতা: একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে আসছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থবছরের সময়কাল ভিন্ন—ভারতে এপ্রিল–মার্চ এবং বাংলাদেশে জুলাই–জুন। ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুই দেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতার মধ্যে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। ভারত এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরের সঙ্গে বাজেট প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় এবং বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করছে। তবে ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে শুধুমাত্র অর্থবছরের সময়সূচির ফল হিসেবে দেখা সঠিক হবে না। কর সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন, অবকাঠামো বিনিয়োগ, আর্থিক খাতের উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা—সব মিলেই ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা গঠিত হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য ভারতের শিক্ষা হলো—অর্থবছর পরিবর্তন একটি সহায়ক কাঠামো তৈরি করতে পারে, তবে এটি কোনো একক সমাধান নয়।
যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা
এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্যও এপ্রিল–মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে। কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং হংকংয়ের মতো অর্থনীতিতেও এই সময়সূচি ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অক্টোবর–সেপ্টেম্বর এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড জুলাই–জুন অর্থবছর অনুসরণ করে। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছর কাঠামো সর্বজনীনভাবে সর্বোত্তম নয়। একটি দেশের কৃষি ব্যবস্থা, আবহাওয়া, করনীতি, ব্যবসায়িক চক্র, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই অর্থবছর নির্ধারণ করা অধিক যুক্তিযুক্ত।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
অর্থবছর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে transition management বা রূপান্তর ব্যবস্থাপনা। সরকারি হিসাবরক্ষণ, বাজেট সফটওয়্যার, কর প্রশাসন, ব্যাংকিং রিপোর্টিং, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অডিট ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আইন ও বিধিমালার সঙ্গে নতুন সময়সূচির সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া একটি পরিবর্তনকালীন বছর তৈরি হলে আয়-ব্যয়, প্রবৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি এবং সরকারি ঋণের তথ্য পূর্ববর্তী বছরের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো—যদি শুধুমাত্র অর্থবছরের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করা হয় কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ধীরগতির দরপত্র প্রক্রিয়া, দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে না। সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যয়ের গুণগত মানকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত সুযোগ
অর্থবছর পরিবর্তনের প্রকৃত সুযোগ নিহিত রয়েছে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কারে। নতুন সময়সূচিকে কেন্দ্র করে যদি—
• উন্নয়ন প্রকল্পের সময়সূচি আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা হয়;
• অর্থছাড় ও প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করা হয়;
• অর্থবছরের শেষ সময়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রবণতা হ্রাস করা হয়;
• প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফলাফল নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়;
• রাজস্ব প্রশাসনকে আরও ডিজিটাল ও কার্যকর করা হয়;
• সরকারি হিসাব ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করা হয়; এবং
• মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর জবাবদিহি জোরদার করা হয়,
তাহলে অর্থবছর পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
অতএব, অর্থবছর ১ জুলাই–৩০ জুন থেকে ১ এপ্রিল–৩১ মার্চে পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ, তবে এটি স্বয়ংক্রিয় সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। কেবল ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতির কাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন অর্থ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত সংস্কার। যদি নতুন অর্থবছরের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের সময়সূচি, বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব সংগ্রহ, সরকারি ক্রয়, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রকল্প মূল্যায়নের কার্যকর সংস্কার যুক্ত করা যায়, তাহলে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যদি শুধুমাত্র হিসাবের বছর পরিবর্তিত হয় এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক দুর্বলতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সমন্বয় হয়েই থেকে যাবে, অর্থনৈতিক সংস্কার নয়। অতএব বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি হলো—অর্থবছর কখন শুরু হবে তা নয়; বরং নতুন অর্থবছরকে কতটা কার্যকর, দক্ষ ও ফলাফলমুখীভাবে ব্যবহার করা যাবে।
লেখক : আমিনুল হক রাসেল।
পিএইচডি ফেলো, ফিনান্স বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। এবং
সহকারী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি।