ফিরোজ আহম্মেদ , ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভার আড়পাড়া, চাপালী ও শ্রীরামপুর এলাকায় দুই শতাধিক পরিবার যেন প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে বসবাস করছে। ঘরবাড়ির ছাদ ও চালের একেবারে ওপর দিয়ে ঝুলে আছে ৩৩ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। কোথাও কোথাও বসতঘরের ছাদ থেকে তারের দূরত্ব মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুট। ফলে শিশু, বৃদ্ধ ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪৫-৫০ বছর আগে এলাকাটি তুলনামূলকভাবে ফাঁকা থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ লাইনটি স্থাপন করা হয়। সময়ের সঙ্গে এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠলেও ঝুঁকিপূর্ণ লাইনটি সরানো কিংবা নিরাপদ দূরত্বে নেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিনের পুরোনো তারও অনেক জায়গায় ঝুলে পড়েছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে আড়পাড়া, নদীপাড়া, মধুপট্টি, কোটচাঁদপুর রোড, মাঠপাড়া, দরগাপাড়া, চাপালী ও শ্রীরামপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য বসতবাড়ির ওপর দিয়ে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন চলে গেছে। অনেক বাড়ির ছাদে ওঠার সিঁড়ি পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছেন বাসিন্দারা। ছাদে কাপড় শুকানো, নির্মাণকাজ কিংবা সামান্য কোনো মেরামতের কাজ করতেও ভয় পাচ্ছেন তারা।
আড়পাড়া দরগাপাড়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আব্দুল জব্বার বলেন, আমাদের এলাকার বহু বাড়ির ওপর দিয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টের তার ঝুলে আছে। পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে, সেই ভয় নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে।
নদীপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা মো. শওকত আলী বলেন, প্রায় অর্ধশত বছর আগে যখন লাইনটি স্থাপন করা হয়, তখন এখানে তেমন বসতবাড়ি ছিল না। পরে ধীরে ধীরে ঘনবসতি গড়ে উঠেছে। তার দাবি, গত তিন দশকে এই এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে অন্তত চার-পাঁচজনের প্রাণ গেছে এবং আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের তারগুলো এখন অনেক ঘরের ছাদ ও চালের সঙ্গে প্রায় লেগে থাকার মতো অবস্থায়। কত মানুষ যে এই লাইনের কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন, তার হিসাব নেই। আমরা চাই, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিক।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজগর আলী বলেন, প্রায়ই ছাদে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা শোনা যায়। ২০২৩ সালে কালুখালী গ্রামের এক রংমিস্ত্রি নদীপাড়ায় একটি বাড়িতে রং করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, দুর্ঘটনায় আহত অনেককে চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এ কারণে অনেক পরিবার ছাদে ওঠার সিঁড়ি পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে।
নদীপাড়ার বাসিন্দা আক্তার হোসেন দোলা বলেন, আমাদের বাড়ির ওপর দিয়েই ৩৩ হাজার ভোল্টের তার গেছে। বাড়ি নির্মাণের সময় আমরা বুঝতে পারিনি এটি কতটা ভয়ংকর। এখন ছাদে উঠতেও ভয় লাগে। কয়েক বছর আগে ডিসলাইনের কাজ করার সময় উচ্চ ভোল্টেজের লাইনের সঙ্গে সামান্য সংযোগে বিকট শব্দ হয় এবং অনেক বাড়ির টিভি, ফ্রিজ, ফ্যানসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটলেও দীর্ঘদিনেও ঝুঁকি নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উচ্চ ভোল্টেজের লাইনটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে যাওয়ায় অনেকে নতুন করে বাড়ি নির্মাণও করতে পারছেন না। কেউ কেউ জমি থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করতে পারছেন না; আবার কেউ কষ্ট করে কেনা জমি বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বাসিন্দাদের মতে, লাইনটি মেরামত করে আরও উঁচু করা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা অথবা সম্ভব হলে ঘনবসতি থেকে সরিয়ে সড়কের পাশ দিয়ে নেওয়া হলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসতে পারে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কোনো একদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী দীন মোহাম্মদ মহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বলতে পারবেন না। তিনি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্ত গীনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্ত গীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। কালীগঞ্জের আবাসিক প্রকৌশলীর কাছ থেকে জেনে নিন।
কালীগঞ্জে আবাসিক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (অফিস হেড) জয়দীপ সরকার বলেন, লাইনটি অনেক আগে স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তবে এটি সরানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ বিষয়ে আবেদন করা হলে আমি তা করতে পারি। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইস্টিমেট চাইবেন। ব্যয়ের হিসাব দেখার পর কর্তৃপক্ষ এটি এখনই করবে কি না, সেটি তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়।
এদিকে, দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে বসবাস করা স্থানীয় পরিবারগুলোর দাবি, কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার পর নয়, তার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ লাইনটির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তারা দ্রুত লাইনটি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া অথবা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে ঝুঁকিমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসী স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, কালীগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুধী সমাজ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, একটি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার অপেক্ষা না করে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হোক।