শিরোনাম
◈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: রয়টার্সকে প্রেস সচিব ◈ ইতালির তৃতীয় বিভাগ ক্লাব রাভেনা এফসির অংশীদার হলেন রোনালদিনহো ◈ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ◈ ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের শপথ আজ: বঙ্গভবনে অতিথিদের ভিড়, জোরদার নিরাপত্তা ◈ ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন কঠিন, ঝুঁকিতে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন ◈ বিমান থেকে সরানো হচ্ছে আফরোজাকে, পাচ্ছেন যে মন্ত্রণালয় ◈ সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে যা বলছে ভারত ◈ রাজস্থানে ককরোচ পার্টির ওপর হামলা, বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ◈ তারেক রহমানের সফরের প্রস্তুতির খবর দিয়ে আবার প্রত্যাহার করল ভারত ◈ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, শপথ আজ সন্ধ্যায়

প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৫৮ বিকাল
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৪৬ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন কঠিন, ঝুঁকিতে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন

বাংলাদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপ এখনো স্বপ্নের গন্তব্য। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে ইউরোপমুখী হওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। দেশে কাঙ্ক্ষিত চাকরির অভাব, তুলনামূলক কম আয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পরিবারের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা এবং ইউরোপে থাকা স্বজনদের সাফল্যের গল্প তরুণদের এই পথে টেনে নেয়। অনেক পরিবার এসএসসি বা এইচএসসি শেষ করেই সন্তানকে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু ইউরোপের সেই পুরোনো বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে অনিয়মিত পথে ইউরোপে আসা এবং পরে কোনোভাবে বৈধ হয়ে যাওয়ার যে ধারণা বহু বছর ধরে বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে ছিল, সেটি এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এর বড় পরিবর্তন এসেছে ২০২৬ সালের ১২ জুন থেকে। এদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন Pact on Migration and Asylum বাস্তবে প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এটি একটি একক নতুন আইন নয়, বরং অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থা সংস্কারের ১০টি আইনি ব্যবস্থার সমন্বিত কাঠামো। এর আওতায় ইউরোপের বহিঃসীমায় আগত অনিয়মিত অভিবাসীদের নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাই, আশ্রয় আবেদনের দ্রুততর প্রক্রিয়া, কোন দেশ আবেদনটি বিবেচনা করবে তা নির্ধারণ এবং যাদের থাকার অধিকার নেই তাদের প্রত্যাবাসন আরও কার্যকর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বাংলাদেশিদের জন্য পরিবর্তনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ১২ জুন থেকেই বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন ‘নিরাপদ উৎসদেশ’-এর তালিকায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ বাংলাদেশিরা আশ্রয় চাইতে পারবেন না, এমন নয়। তবে নির্দিষ্ট শর্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন দ্রুততর প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৩৭ হাজার বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদন, স্বীকৃতি মাত্র ৩ শতাংশ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের সর্বশেষ বার্ষিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে EU+ অঞ্চলে বাংলাদেশিরা প্রায় ৩৭ হাজার আশ্রয় আবেদন করেছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় আবেদন কমেছে ১৫ শতাংশ। তারপরও বাংলাদেশিরা আশ্রয় আবেদনকারী নাগরিকত্বের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে ছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৫ সালে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের প্রথম দফার আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ ইউরোপে পৌঁছে আশ্রয় আবেদন করলেই সেখানে বৈধভাবে থেকে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বরং বাংলাদেশি আবেদনকারীদের বড় অংশকেই আবেদন প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে ‘কাগজ’ করার পথও কঠিন
বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি ধারণা ছিল, ইতালি বা ফ্রান্সে কাগজ না হলে পর্তুগাল, স্পেন কিংবা অন্য কোনো দেশে গিয়ে নতুন করে বৈধ হওয়ার চেষ্টা করা যাবে। অতীতে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব নিয়মিতকরণ ব্যবস্থার কারণে কিছু ক্ষেত্রে এমন সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। এর অন্যতম কারণ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও অভিন্ন ডাটাবেস ব্যবহার। Schengen Information System বা SIS-এ নির্দিষ্ট ধরনের প্রত্যাবর্তন সিদ্ধান্ত এবং প্রবেশ বা অবস্থান নিষেধাজ্ঞার সতর্কতা সংরক্ষণ করা হয়। ফলে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন সতর্কতা থাকলে অন্য শেনজেন দেশের কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই তথ্য দেখতে পারে।

এ কারণে ফ্রান্সে অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হওয়ার পর স্পেন বা পর্তুগালে গিয়ে আগের ইতিহাস সম্পূর্ণ আড়াল করে নতুন করে বৈধ হওয়ার পথ আগের তুলনায় অনেক কঠিন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। 
OQTF, IRTF এবং SIS alert এক জিনিস নয়। ফ্রান্সের OQTF হলো দেশ ছাড়ার প্রশাসনিক নির্দেশ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর সঙ্গে IRTF, অর্থাৎ ফ্রান্সে ফেরার নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তির তথ্য SIS-এ কী ধরনের সতর্কতা হিসেবে রয়েছে, সেটিও আলাদা বিষয়। তাই প্রতিটি OQTF স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো শেনজেন এলাকায় তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

পর্তুগালের পুরোনো সুযোগও আর নেই
একসময় পর্তুগাল ছিল বাংলাদেশিদের কাছে ইউরোপে বৈধ হওয়ার জনপ্রিয় গন্তব্য। সেখানে কাজ শুরু করে পরে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার যে ব্যবস্থা বহু অভিবাসী ব্যবহার করেছেন, তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি Manifestação de Interesse ২০২৪ সালের ৪ জুন থেকে বাতিল করা হয়েছে।

ফলে ‘পর্তুগালে গিয়ে কাজ শুরু করলেই পরে কাগজ হয়ে যাবে’ এই পুরোনো ধারণা এখন আর নির্ভরযোগ্য নয়।

বিয়ে করলেই বৈধ হওয়ার নিশ্চয়তা নেই
ইউরোপে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, কোনো বৈধ ব্যক্তি বা নাগরিককে বিয়ে করলেই অনিয়মিত অবস্থান থেকে সহজে বৈধ হওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। 

বিয়ে করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বসবাসের অনুমতি বা নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না। প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক, একসঙ্গে বসবাস, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে বিয়েকে ইউরোপে বৈধ হওয়ার সহজ শর্টকাট হিসেবে দেখা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়।

প্রত্যাবাসনে ইউরোপের কঠোর অবস্থান
ইউরোপের পরিবর্তিত নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে প্রত্যাবাসন।

Eurostat-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৫০ জন তৃতীয় দেশের নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই বছরে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬০ জনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রত্যাবাসনের এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

এই সংখ্যা বাংলাদেশিদের নয়, সব তৃতীয় দেশের নাগরিককে নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক হিসাব। তবে এটি ইউরোপের প্রত্যাবাসন নীতি জোরদার হওয়ার একটি স্পষ্ট চিত্র।
২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৩৯৫ জন তৃতীয় দেশের নাগরিককে অনিয়মিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি এমন ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে।

সমুদ্রপথে যাওয়ার ঝুঁকি, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টা বাংলাদেশিদের একটি অংশের মধ্যে এখনো রয়েছে। EUAA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বহিঃসীমা অনিয়মিতভাবে অতিক্রমের ঘটনায় বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া নাগরিকত্বগুলোর মধ্যে ছিলেন, বিশেষ করে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে।

কিন্তু এই পথ ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে শুধু বাংলাদেশি নাগরিক কতজন ভূমধ্যসাগরে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাভিত্তিক সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। তাই অনুমাননির্ভর কোনো সংখ্যা দিয়ে আতঙ্ক তৈরি করার বদলে নিশ্চিত তথ্যের মধ্যেই থাকা জরুরি।

কেন স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে
বাংলাদেশের তরুণরা ইউরোপে আসতে চান কারণ তারা দেশে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ দেখতে চান। উচ্চশিক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়া, আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের দায়িত্ব তাদের বিদেশমুখী করে। ইউরোপে থাকা আত্মীয়স্বজনের তুলনামূলক সচ্ছল জীবনও তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

কিন্তু ইউরোপে এসে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা একজন তরুণের বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা।

বৈধ কাগজ না থাকলে নিয়মিত চাকরি পাওয়া কঠিন। বাসস্থান পাওয়া কঠিন হতে পারে। প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়। আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও পরিচয় যাচাইয়ের বিস্তৃত ব্যবস্থা।

ফলে এক দেশে সমস্যায় পড়ে অন্য দেশে গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার পুরোনো পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ইউরোপের দরজা বন্ধ হয়নি, বন্ধ হচ্ছে অবৈধ শর্টকাট
ইউরোপের বৈধ অভিবাসনের পথ এখনো খোলা রয়েছে। শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী, বৈধ চাকরি, পরিবার পুনর্মিলনসহ বিভিন্ন আইনি পথে ইউরোপে আসার সুযোগ আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেও দক্ষ কর্মী, শিক্ষা ও বৈধ অভিবাসনের পথ চালু রেখেছে।

কিন্তু অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করে পরে কাজ করে বা অন্য দেশে গিয়ে কোনোভাবে বৈধ হয়ে যাওয়ার পুরোনো ধারণা ক্রমেই অকার্যকর হচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

ইউরোপের স্বপ্ন শেষ হয়নি। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ এখন হতে হবে বৈধ, পরিকল্পিত এবং তথ্যভিত্তিক। দালালের কথায় বিপুল অর্থ খরচ করে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে গিয়ে পরে ‘কোনো না কোনোভাবে কাগজ হয়ে যাবে’ এমন নিশ্চয়তা আর নেই।
একসময় ইউরোপ ছিল বাংলাদেশের বহু তরুণের কাছে স্বপ্নের সোনার হরিণ। এখন সেই স্বপ্নের পথে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, তথ্য যাচাই, নতুন আশ্রয়নীতিমালা, প্রত্যাবাসন এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাস্তবতা স্পষ্ট।

ইউরোপ এখনো স্বপ্নের গন্তব্য হতে পারে, কিন্তু অবৈধ পথে ইউরোপে গিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ক্রমেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। উৎস: মানবজমিন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়