শিরোনাম
◈ নতুন পাঁচজনকে নিয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল, কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন? ◈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: রয়টার্সকে প্রেস সচিব ◈ ইতালির তৃতীয় বিভাগ ক্লাব রাভেনা এফসির অংশীদার হলেন রোনালদিনহো ◈ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ◈ ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের শপথ আজ: বঙ্গভবনে অতিথিদের ভিড়, জোরদার নিরাপত্তা ◈ ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন কঠিন, ঝুঁকিতে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন ◈ বিমান থেকে সরানো হচ্ছে আফরোজাকে, পাচ্ছেন যে মন্ত্রণালয় ◈ সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে যা বলছে ভারত ◈ রাজস্থানে ককরোচ পার্টির ওপর হামলা, বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ◈ তারেক রহমানের সফরের প্রস্তুতির খবর দিয়ে আবার প্রত্যাহার করল ভারত

প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৩৫ রাত
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভিয়েতনামের বদলে বাংলাদেশে কারখানা, এখন ৭০ দেশে রপ্তানি হয় ইউক্রেনের বাবা-ছেলের জুতা

২০০৭ সালের আগস্ট মাস। ইউক্রেনের এক বাবা ও ছেলে ভিয়েতনামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিলেন। সেখানে যাওয়ার পথে তারা অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করেন।

হোটেলে থাকার সময় ছেলে লাভরিক আন্দ্রিতির মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশেই যখন তারা যা খুঁজছেন তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তখন ভিয়েতনামে যাওয়ার দরকার কী?

তিনি বলেন, 'আমি বাংলাদেশের ট্যানারি ও চামড়া শিল্পের কথা শুনেছিলাম। তাই বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশে বিশাল জনসংখ্যা রয়েছে এবং এখানে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভালো সুযোগ আছে। তাহলে আমরা ভিয়েতনামে যাব কেন?'

এরপর মিলল এক অপ্রত্যাশিত সূত্র—'ইয়েলো পেজেস'-এর একটি কপি। 

হোটেলে সেটি হাতে নিয়ে আন্দ্রিতি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পান। এরপর তিনি ও তার বাবা বেপজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন।

আন্দ্রিতি বলেন, 'আমরা বেপজায় গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করি। তাদের ভালো লেগেছিল এবং তারা আমাদের পুরোপুরি সহযোগিতা করেছিলেন। এরপর আমরা ভিয়েতনাম না গিয়ে বাংলাদেশেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই। এই সিদ্ধান্তে আমরা খুশি।'

সেই অনাকাঙ্ক্ষিত যাত্রাবিরতিই শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় 'সুপার প্রোটেকটিভ শুজ (প্রাইভেট) লিমিটেড' প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি এখন বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক বুট, নিরাপত্তা জুতা ও অন্যান্য বিশেষায়িত জুতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে।

আদমজী থেকে বৈশ্বিক বাজারে

উৎপাদন শুরুর প্রায় দুই দশক পর এখন সুপার প্রোটেকটিভ শুজ বিশ্বের প্রায় ৬০-৭০টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন, জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজার।

প্রতিষ্ঠানটি সেফটি, ওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও সামরিক জুতা তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে বুট, পিইউ পণ্য ও ইনসোল। মোট রপ্তানির প্রায় ১০ শতাংশ সামরিক জুতা। এর বেশির ভাগই যায় ইউক্রেনে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে সুপার প্রোটেকটিভ শুজ। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১ হাজার মানুষ কাজ করেন। অর্ডারের ওপর নির্ভর করে কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হয়।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্দ্রিতি জানান, ইউক্রেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্য; বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের কার্যালয় রয়েছে। জার্মানিতেও একটি বড় গুদাম রয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন বাজারে পণ্য সরবরাহ করা হয়।

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত ও অত্যন্ত হালকা সেফটি জুতা তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দুই বছরের মধ্যে বার্ষিক রপ্তানি ৫০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্দ্রিতি বলেন, 'আমরা বাংলাদেশে আরও ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছি।'

যন্ত্রের সঙ্গে শ্রমিকের দক্ষতার সমন্বয়

আদমজী কারখানার ভেতরে, একেক জোড়া জুতার সঙ্গে গড়ে উঠছে সেই বৈশ্বিক ব্যবসা। 

চলতি সপ্তাহে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের কারখানা পরিদর্শনের সময় দেখতে যায়, উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে শ্রমিকেরা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন।

কারখানার এক প্রান্তে জুতার নকশা অনুযায়ী চামড়া কাটা হচ্ছিল। অন্যদিকে শ্রমিকেরা বিভিন্ন অংশ সেলাই, নকশার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া, সোল লাগানো ও জুতা তৈরির কাজ করছিলেন। কেউ কেউ আবার কম্পিউটার স্ক্রিনে উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

চামড়া কাটা, সেলাই, সংযোজন, ছাঁচ তৈরি ও ফিনিশিং—এভাবে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে জুতা প্যাকেজিং বিভাগে যায়। পুরো প্রক্রিয়ায় আধুনিক যন্ত্রের পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতাও ব্যবহার করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, জুতায় ব্যবহৃত বেশির ভাগ চামড়া আসে ব্রাজিল, ইউক্রেন, ভারত ও তুরস্ক থেকে। কিছু চামড়া আসে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকেও।

উৎপাদন বিভাগে ছিলেন লিজা আক্তার। তিনি জুতার নকশা অনুযায়ী চামড়া কাটার একটি যন্ত্র চালাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, কর্মস্থলে ভালো সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এবং মাসে প্রায় ২৩ হাজার টাকা আয় করেন।

প্যাকেজিং বিভাগে তৈরি জুতা প্যাক করছিলেন নিয়ামত আলী। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা নিয়ামত ২০১৯ সাল থেকে এই কারখানায় কাজ করছেন।

তিনি বলেন, বেতন ও কর্মপরিবেশ ভালো হওয়ায় অন্য কোথাও কাজ না খুঁজে এই প্রতিষ্ঠানেই থেকে গেছেন।

টেকসই মান বজায় রেখে সেফটি জুতা আরও হালকা করতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে সুপার প্রোটেকটিভ শুজ।

আন্দ্রিতি বলেন, 'অত্যন্ত হালকা সেফটি জুতা তৈরির জন্য আমরা নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসছি। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি নতুন এবং আমাদের জানা মতে, বিশ্বেও এটি প্রথম দিককার প্রযুক্তিগুলোর একটি।'

উন্নত যন্ত্রের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের আউটসোল তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে সেফটি জুতার ওজন কমবে, তবে এর স্থায়িত্ব বজায় থাকবে।

আন্দ্রিতি বলেন, তরুণ ক্রেতাদের মধ্যে হালকা জুতার চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ, ইউরোপ ও চীনের বাজারেও এই চাহিদা রয়েছে। তবে কর্মক্ষেত্রে সেফটি জুতা ব্যবহারকারীদের জন্য জুতা টেকসই হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, 'এ কারণেই আমরা এই প্রযুক্তি নিয়ে আসছি। এর মাধ্যমে টেকসই ও অত্যন্ত হালকা দুই বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে সেফটি জুতা তৈরি করা হবে।'

প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরোপ, তাইওয়ান ও চীন থেকে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া নতুন কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হচ্ছে। এগুলো চালু হলে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার জোড়ায় উন্নীত হবে। উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মীর সংখ্যাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পণ্য সংগ্রহ

বাংলাদেশে জুতা তৈরির প্রযুক্তি ও সহায়ক শিল্পের উন্নতির ফলে সুপার প্রোটেকটিভ শুজ এখন কিছু সরঞ্জাম ও উৎপাদন উপকরণ দেশ থেকেই সংগ্রহ করতে পারছে।

আন্দ্রিতি বলেন, 'এখন বিভিন্ন সরঞ্জাম ও উৎপাদন উপকরণ দেশেই তৈরি হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য খুবই সহায়ক। কারণ এসবের মধ্যে কিছু জিনিস আমরা স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করতে পারছি।'

সুপার প্রোটেকটিভ শুজের এই প্রবৃদ্ধির সময়ে আদমজী ইপিজেডেও রপ্তানিমুখী বিনিয়োগ বাড়ছে।

আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ইপিজেডটিতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে সহায়তা করেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডের ৪৭টি কারখানা ১.১৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

ভূঁইয়া বলেন, 'আরও ১০টি কারখানা বর্তমানে নির্মাণাধীন। এগুলোতে উৎপাদন শুরু হলে বার্ষিক রপ্তানি ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।'

বাড়ছে ব্যবসা, কমছে জায়গা

তবে সুপার প্রোটেকটিভ শুজের জন্য ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে নতুন একটি সমস্যাও তৈরি হয়েছে, আর সেটি হলো জায়গার সংকট।

আন্দ্রিতি বলেন, 'আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য জায়গা খুঁজছি। কিন্তু এই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় এখন খালি জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।'

তিনি বলেন, বেপজার মতো সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এমন জমি বাংলাদেশে পাওয়া গেলে অন্য কোথাও বিনিয়োগের কথাও বিবেচনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রায় দুই দশক আগে এক বাবা ও ছেলে ভ্রমণপথ বদলে ভিয়েতনামের পরিবর্তে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে গড়ে তোলা সেই প্রতিষ্ঠান এখন আরও বড় হওয়ার জন্য নতুন জায়গা খুঁজছে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়