আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো, আদায় বাড়ানো এবং মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আওতায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠান একাধিক প্যানেল গঠন করে খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
এসব প্যানেলে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি থাকতে পারবে না। খেলাপি ঋণ আদায়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো একটি অংশ কমিশন হিসাবে পাবে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) আওতায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তাতে এসব সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়।
বৃহস্পতিবার এ নীতিমালা সার্কুলার আকারে জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এখন থেকে ওই নীতিমালার আওতায় খেলাপি ঋণ আদায় করতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি এদের তদারকিও করা হবে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ভয়ানকভাবে বেড়ে যায়। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এখন থেকে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ অনেক দেশে এ ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে। বাংলাদেশেও এ পদক্ষেপ সীমিত আকারে নেওয়া হয়েছিল। এখন নীতিমালা করে আইনি প্রক্রিয়ায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো হচ্ছে।
নীতিমালায় বলা হয়, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান হিসাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনে আর্থিক খাতের গ্রাহকদের গোপনীয়তা রক্ষার অঙ্গীকার থাকতে হবে। এ অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে বা স্বার্থের সংঘাত গোপন করলে অথবা এই নীতিমালার কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিধান লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদ ও শর্তসাপেক্ষে প্রতিষ্ঠানটির তালিকাভুক্তি স্থগিত করতে পারবে।
কোনো তালিকাভুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা বা অসদাচরণে জড়িত হলে ধারাবাহিকভাবে এই নীতিমালা বা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত পেশাগত মানদণ্ড অনুযায়ী সেবা প্রদানে ব্যর্থ হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে তালিকাবহির্ভূত করতে পারবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করলে, স্থগিতাদেশের কারণ নিরসনে ব্যর্থ হলে অথবা এমন কোনো কার্যকলাপে লিপ্ত হলে; বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা বা সুনাম ক্ষুণ্ন করে- এমন কিছু করলে বাংলাদেশ ব্যাংক কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ প্রদান সাপেক্ষে তাকে তালিকাবহির্ভূত করতে পারবে।
কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি স্থগিত বা তালিকাবহির্ভূত করার ফলে চলমান কার্যক্রম অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতে পারবে। একই সঙ্গে অন্য তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তরের নির্দেশনাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়, বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আওতায় মধ্যস্থতা সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্যানেলে তালিকাভুক্ত থাকা ব্যক্তিদের ব্যাংক/ফাইন্যান্স কোম্পানি, আইন পেশা, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা, বিচারকার্যে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি ও নৈতিক স্খলনজনিত কারণে চাকরি বা পেশা থেকে বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিরা এতে থাকতে পারবে না। কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণখেলাপিরাও থাকতে পারবে না। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এতে থাকতে পারবে না।
এতে আরও বলা হয়, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদরকি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বছর ভিত্তিতে তাদের কার্যক্রমের প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করতে হবে।
ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ, সেগুলোর তালিকা মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হবে। তবে তাদের এ বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে খেলাপি ঋণ আদায়ে কাজ করতে হবে।