হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রাস্তার দুপাশে রোপণকৃত সরকারি গাছ উজাড়ের তাণ্ডব কোনোভাবেই থামছে না। অপরাধীদের চিহ্নিত করে প্রশাসনিকভাবে দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে স্থানীয় একটি সক্রিয় ‘গাছখেকো’ চক্র। সামাজিক বনায়নের সুরক্ষায় স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসনের নজরদারির অভাবকেই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সচেতন মহল।
সম্প্রতি গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাতের আঁধারে কেটে নেওয়া হচ্ছে একের পর এক মূল্যবান গাছ। ফলে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের পরিবেশবান্ধব সামাজিক বনায়ন উদ্যোগ এবং হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশের ভারসাম্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আলফাডাঙ্গা উপজেলার লাঙ্গুলিয়া থেকে বড়ভাগ উত্তরপাড়া ব্রিজ সংলগ্ন প্রায় ৫০০ মিটার এলাকাজুড়ে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির মেহগনি গাছের গোড়ায় কিছুদিন আগে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে অন্তত ২০টি গাছের গোড়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৪টি গাছ সম্পূর্ণ কয়লা হয়ে যায়। এ ঘটনার তোলপাড়ের মধ্যেই লাঙ্গুলিয়ার মৃত রুস্তম মোল্যার বাড়ি থেকে বিদ্যাধর আলীম মোল্যার বাড়ি পর্যন্ত রোপণকৃত গাছের ওপর পুনরায় নজর পড়ে সেই চক্রের। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে রাতের আঁধারে বিদ্যাধর কালভার্ট সংলগ্ন একটি বড় আকৃতির আকাশমণি গাছ কেটে সাবাড় করে নিয়ে গেছে তারা।
ক্রমাগত সরকারি সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। লাঙ্গুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা খিজির মোল্যা আক্ষেপ করে বলেন, "দুর্বৃত্তরা এখন কোনো ভীতি ছাড়াই নিয়মিত সরকারি গাছের ওপর তাণ্ডব চালাচ্ছে। কখনও গাছের গোড়া পুড়িয়ে মারছে, আবার কখনও গোড়াসুদ্ধ কেটে নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। সব দেখেও আমরা অসহায়, গাছের সঙ্গে মানুষের এমন বর্বর শত্রুতা মেনে নেওয়া যায় না।"
আলফাডাঙ্গা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সৈয়দ শরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "গাছখেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠিন ও দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে এ অঞ্চলের সরকারি বনায়ন ও বৃক্ষসম্পদের অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রশাসনের কাছে আমাদের জোর দাবি—অনতিবিলম্বে এ চক্রকে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।"
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক বনায়নের গাছ ধ্বংসকারী চক্রকে চিহ্নিত করতে ইতোমধ্যেই তারা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তদন্তে লাঙ্গুলিয়া-বিদ্যাধর এলাকায় গাছ কাটার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছে বন বিভাগ।
অভিযুক্তরা হলেন—বিদ্যাধর গ্রামের হাসান গাজীর ছেলে মো. রিয়াজ গাজী (২৬) এবং একই এলাকার মৃত সৈয়দ ওমর আলীর ছেলে সৈয়দ বাবু আলী (৩২)।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আলফাডাঙ্গা উপজেলা বন কর্মকর্তা শেখ লিটন বলেন, "সরকারি সম্পদ বিনষ্টকারী ও সামাজিক বনায়ন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন রেঞ্জ অফিসে পাঠানো হবে এবং পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হবে।"