শিরোনাম
◈ ঘুষের টাকা দিয়ে পোশাক লাগিয়েছি ঘুষ খাব না তো কি বায়তুল মোকাররমের ইমাম হব: এএসআইর বক্তব্যে তোলপাড় ◈ দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত শপিংমল-দোকান খোলা রাখা যাবে ◈ ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ◈ ৬ দিন বন্ধ থাকছে একাধিক ব্যাংকের অনলাইন-এটিএম-কার্ডসহ নানা সেবা ◈ বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিং লাইভ সিসিটিভিতে দেখানোর দাবিতে আইনি নোটিশ ◈ দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি, আগের শনিবার খোলা থাকবে অফিস ◈ খাদ্য নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৩০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি ◈ নির্মাণকাজে সংকুচিত হচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্যের হাতির চলার পথ, বাড়ছে ট্রেন সংঘর্ষের ঝুঁকি ◈ এক কূপে মিলল গ্যাস, এবার যমুনার ওপারেও অনুসন্ধানের ভাবনা ◈ আ‌র্জেন্টিনার জা‌র্সিতে বুধবার ভোর ৫টায় মেসির বিদায়ী ম্যাচ 

প্রকাশিত : ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৯ রাত
আপডেট : ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নির্মাণকাজে সংকুচিত হচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্যের হাতির চলার পথ, বাড়ছে ট্রেন সংঘর্ষের ঝুঁকি

সড়ক সম্প্রসারণ, আলোকসজ্জা ও রেল অবকাঠামোর কারণে লোহাগাড়ার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে হাতির চলাচল ক্রমেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথ বা করিডোর সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ট্রেনের সঙ্গে হাতির সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ৯০০ মিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলায় সাতঘর হাতি করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ প্রায় দুই মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে সড়কের দুই পাশের বনাঞ্চলের মধ্যে ব্যাহত হচ্ছে হাতির চলাচল।

চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূর জাহান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "চুনতি সংরক্ষিত বনের সাতঘর করিডরে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এ কারণে গত দুই মাস ধরে হাতি পূর্ব দিকের বান্দরবানসহ পাহাড়ি এলাকা থেকে পশ্চিমের সংরক্ষিত বনে যেতে পারছে না। সড়কের দুই পাশে মাটি কাটা হচ্ছে, শ্রমিকরাও কাজ করছেন। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। করিডরের দুই পাশে হাতির পাল এলেও তারা পার হতে পারছে না।"

দেড় বছর আগে থেকেই চুনতি মহাসড়কের ওভারপাস এলাকায় আলোকসজ্জা ও সাইনবোর্ডের কারণে হাতির চলাচল অনেকটা কমে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি।

advertisement

সড়কের কাজের কারণে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে হাতি চলাচলের জন্য নির্মিত একটি ওভারপাস ও দুটি আন্ডারপাসে যাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই রেলপথের প্রায় ২৭ কিলোমিটার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে।

নূর জাহান বলেন, খাবারের সন্ধানে স্বাভাবিক পথে চলাচল করতে না পেরে হাতিগুলো এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ধানখেতেও ঢুকে পড়ছে হাতি।

এ অবস্থায় সড়কটির সম্প্রসারণকাজ দ্রুত শেষ করতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে বন বিভাগ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হলে হাতির নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সেখানে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরিবেশগত সুরক্ষা পরামর্শক আসিফ ইমরান টিবিএসকে বলেন, "বন বিভাগের সাতঘর বিট অফিসের সীমানা ও আলোকসজ্জার কারণে প্রায় আট মাস এই করিডরে হাতি চলাচল করেনি। অর্থাৎ পশ্চিমে বান্দরবান ও পূর্বে চুনতি—দুই দিকের হাতিই এই পথ ব্যবহার করেনি। পূর্বদিকের হাতির পালের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে তারা আন্ডারপাস ও ওভারপাস ব্যবহার না করলেও পশ্চিমদিকের হাতিগুলো এগুলো ব্যবহার করছে।"

চাপে হাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও বাঁশখালী এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ১৯ হাজার ১৮৫ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। একসময় গর্জনগাছপ্রধান এই বনে এখন গুটিকয়েক গর্জনগাছ অবশিষ্ট রয়েছে।

২০১৬ সালে রেলপথ নির্মাণের জন্য চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের ২৭৬ একর বনভূমি অবমুক্ত করে সরকার। সেখানে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ কাটা এবং ২৬টি পাহাড়ের আকৃতি পরিবর্তন করা হয়। এলাকাটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের এশীয় হাতির অন্যতম প্রধান আবাসস্থল।

এই অভয়ারণ্যে বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০টি এশীয় হাতি রয়েছে। এগুলো লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চকরিয়ার বনাঞ্চলে চলাচল করে এবং বিভিন্ন স্থানে রেললাইন পার হয়। ২০১৮ সালের মার্চে রেলপথ প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং গত বছর তা শেষ হয়।

২০১৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) তিনটি বনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ২৭ কিলোমিটার রেলপথে হাতির চলাচলের পথ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করে। ওই গবেষণায় হাতি চলাচলের ১৬টি করিডর চিহ্নিত করা হয়। খাদ্য ও পানির খোঁজে এক আবাসস্থল থেকে অন্য আবাসস্থলে যেতে এসব করিডর ব্যবহার করে হাতি।

তবে ২০১৮ সালে জীববৈচিত্র্যের ওপর রেলপথ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়নে এডিবির 'বেসলাইন বায়োডাইভারসিটি অ্যাসেসমেন্ট' (বিবিএ) প্রতিবেদনে মাত্র একটি ওভারপাস ও দুটি আন্ডারপাস নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। 

বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, হাতি বিশেষজ্ঞ ও বন কর্মকর্তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে এ সুপারিশ করা হয়েছিল। বনাঞ্চলে হাতির অবাধ চলাচলের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্মিত একটি ওভারপাস ও দুটি আন্ডারপাস অপ্রতুল বলেও শুরু থেকেই বলে আসছেন তারা।

আইইউসিএনের 'এলিফ্যান্ট রুট আইডেন্টিফিকেশন স্টাডি'র অন্যতম প্রধান গবেষক ও হাতি বিশেষজ্ঞ এইচ এম রায়হান সরকার এর আগে টিবিএসকে বলেছিলেন, "পারাপারের পথ কমিয়ে দেওয়ায় হাতি ও ট্রেনের সংঘর্ষের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা এক দশকের মধ্যে এশীয় হাতির অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলতে পারে।"

নষ্ট করা হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা, ব্যাহত পর্যবেক্ষণ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইনে না উঠে আন্ডারপাস, ওভারপাস বা কালভার্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হাতির সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এ কারণে হাতির আচরণ ও এসব পারাপারের পথ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কিন্তু এ কাজে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো বারবার ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

২০২৫ সালের আগস্টে এক রাতেই সাতটি সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে দেওয়া হয়। গত তিন মাসে একটি আন্ডারপাসের দুটি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়েছে। সাত মাস আগে ওভারপাসের ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়েছিল।

এডিবির পরিবেশগত সুরক্ষা পরামর্শক আসিফ ইমরান বলেন, দুর্ঘটনা ঠেকাতে রেলপথের চুনতি অংশের দুই পাশে মোট আট কিলোমিটার আরসিসি ফেন্সিং করা হয়েছে। ফেন্সিংয়ের শেষ অংশগুলো কালভার্টের প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে হাতি রেললাইনে উঠতে না পারে।

তিনি বলেন, "শুরুর দিকে হাতিগুলো ফেন্সিংয়ের দেয়ালে ধাক্কা দিত। দেয়ালে কাদা ও বর্জ্যের চিহ্ন পাওয়া যেত। এখন তারা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালে ধাক্কা না দিয়ে ফেন্সিং ধরে হেঁটে নির্দিষ্ট পারাপারের পথ খুঁজে নিচ্ছে।"

আসিফ ইমরান বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হাতির সময় লাগে। এ কারণে তাদের আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু গত দুই বছরে ডাকাতরা বারবার সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে ফেলছে, যাতে ক্যামেরায় তাদের চেহারা ধরা না পড়ে। ফলে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বসেনি এআই ক্যামেরা, ওয়েম্যান নিয়োগের পরিকল্পনা

রেলওয়ে ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এক বছর না পেরোতেই ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর লোহাগাড়ার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এলিফ্যান্ট ওভারপাসের উত্তর পাশে ট্রেনের ধাক্কায় আহত হয়ে একটি হাতিশাবক মারা যায়। বনের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলাচলের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এরপর গত বছরের ২২ জুলাই রাতে একই অভয়ারণ্যে আরেকটি দুর্ঘটনা অল্পের জন্য এড়ানো যায়। হাতির একটি পাল রেললাইনে উঠে এলে লোকোমাস্টার দূর থেকে সেটি দেখতে পেয়ে জরুরি ব্রেক কষে ট্রেন থামান। বারবার হুইসেল দেওয়ার একপর্যায়ে পালের একটি হাতি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের শেষ বগিতে ধাক্কা দেয়। তবে দ্রুত ট্রেনটি চালু করায় বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজার রুটে দিনে ও রাতে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ জোড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে।

উন্মুক্ত রেলপথে হাতির সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ ঠেকাতে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এআই-চালিত সিগন্যাল প্রযুক্তিসম্পন্ন ছয়টি রোবোটিক ও সেন্সর ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

প্রস্তাবিত ক্যামেরাগুলো হাতি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে ছবিসহ সংকেত পাঠাতে পারবে। হাতি বা হাতির পাল রেললাইনে উঠলে রেললাইনের পাশে থাকা লাল বাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠবে। এতে লোকোমাস্টার ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার দূর থেকেই হাতির উপস্থিতি বুঝতে পারবেন। আর ২২০ মিটার দূর থেকে ট্রেন থামানোর জন্য ব্রেক করার সুযোগ থাকবে।

তবে এ ব্যবস্থা স্থাপন না করেই গত বছর দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শেষ করা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এই প্রযুক্তি স্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এডিবির অর্থায়নে চলমান চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর প্রকল্পে এআই ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি যুক্ত করতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) তৈরি করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লাগবে।

এ কারণে অন্তর্বর্তী সময়ে দুর্ঘটনা ঠেকাতে রেলপথে ওয়েম্যান নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ২৭ কিলোমিটার রেলপথে মোট ২০ জন ওয়েম্যান দায়িত্ব পালন করবেন। টহলের সময় তাদের কাছে হাতি সরানোর জন্য বিশেষ ধরনের মাইক বা 'সাউন্ড মেকার' এবং প্রয়োজনে ট্রেন থামানোর জন্য লাল পতাকাসহ সংকেত দেওয়ার সরঞ্জাম থাকবে। তবে এখনো ওয়েম্যান নিয়োগ করা হয়নি।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ