শিরোনাম
◈ ঘুষের টাকা দিয়ে পোশাক লাগিয়েছি ঘুষ খাব না তো কি বায়তুল মোকাররমের ইমাম হব: এএসআইর বক্তব্যে তোলপাড় ◈ দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত শপিংমল-দোকান খোলা রাখা যাবে ◈ ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ◈ ৬ দিন বন্ধ থাকছে একাধিক ব্যাংকের অনলাইন-এটিএম-কার্ডসহ নানা সেবা ◈ বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিং লাইভ সিসিটিভিতে দেখানোর দাবিতে আইনি নোটিশ ◈ দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি, আগের শনিবার খোলা থাকবে অফিস ◈ খাদ্য নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৩০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি ◈ নির্মাণকাজে সংকুচিত হচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্যের হাতির চলার পথ, বাড়ছে ট্রেন সংঘর্ষের ঝুঁকি ◈ এক কূপে মিলল গ্যাস, এবার যমুনার ওপারেও অনুসন্ধানের ভাবনা ◈ আ‌র্জেন্টিনার জা‌র্সিতে বুধবার ভোর ৫টায় মেসির বিদায়ী ম্যাচ 

প্রকাশিত : ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৩ রাত
আপডেট : ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা তাদের। কিন্তু দিনের পর দিন আদালতে আসছেন না। ফলে সাক্ষ্যগ্রহণ এগোচ্ছে না, ঝুলে থাকছে বহু বছরের পুরোনো মামলাও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার ‘পুলিশ সাক্ষী’দের হাজির করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে একের পর এক ‘অতীব জরুরি’ চিঠি পাঠাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জারি হচ্ছে সমন, এমনকি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বর্তমানে কর্মরত এবং দেশের বিভিন্ন ইউনিটে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কালবেলার হাতে আসা সিএমপির একাধিক দাপ্তরিক চিঠি পর্যালোচনা করে এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।

সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য। তাদের কেউ বর্তমানে চট্টগ্রাম, আবার কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে কর্মরত। কেউ আছেন সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এসবির মতো বিশেষায়িত ইউনিটে।

কালবেলার হাতে আসা গত ৩ অক্টোবরের একটি চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত তারিখে সকাল ৯টায় আদালতে হাজির নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

advertisement

চিঠিতে বলা হয়েছে, এসব সাক্ষীকে আগে একাধিকবার সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সর্বশেষ জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও তারা আদালতে হাজির হননি। তাদের অনুপস্থিতিকে মামলা নিষ্পত্তির ‘প্রধান অন্তরায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী হাজির না হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও আদালতের আদেশের বরাত দিয়ে পুলিশ ইউনিটগুলোকে জানানো হয়েছে।

কালবেলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নির্ধারিত এসব পুলিশ সদস্যের অধিকাংশই একসময় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন। তাদের সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো হয়েছে পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানায়।

মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত এবং শিশু আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে।

২২ সালের হত্যা মামলাও আটকে

শুধু নিম্ন আদালতের মামলাই নয়, গুরুতর অপরাধের মামলাতেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত একটি হত্যা মামলায় পুলিশ কমিশনারকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের আদেশে বলা হয়, ২০২২ সালে দায়ের হওয়া ওই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বাদীসহ অন্য সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার জন্য বারবার প্রসেস ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের হাজির করতে পারেনি। ফলে পুরোনো মামলাটি নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না।

আগামী ১৮ নভেম্বর সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কমিশনার, সিএমপি বরাবর আদেশের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) ধারার আলোকে মামলায় কোনো বিরূপ ফল হলে তার দায় পুলিশ কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।

বদলি হয়ে যায় সাক্ষী, থেমে যায় মামলা

আদালতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য পরে অন্য জেলা কিংবা ইউনিটে বদলি হয়ে যাওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আদালত থেকে পাঠানো সমন অনেক সময় পুরোনো কর্মস্থলে পৌঁছায়। পরে তা রিজার্ভ অফিস, সিএমপি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট ঘুরে নতুন কর্মস্থলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে।

কখনো সমন যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর কাছে পৌঁছায় না। আবার পৌঁছালেও নির্ধারিত তারিখে আদালতে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে আদালতে সাক্ষীর অনুপস্থিতি অব্যাহত থাকে।

আদালতের কয়েকজন বেঞ্চ সহকারী জানান, পুলিশ সাক্ষীদের বিরুদ্ধে সমন ও পরোয়ানা জারি হওয়া অনেক ক্ষেত্রে হাজিরা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার অংশ। পরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য আদালতে হাজির হলে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাওয়া হয়। তবে পুরোনো মামলার সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচারকাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

নোয়াখালীতেও একই চিত্র

শুধু চট্টগ্রাম নয়, নোয়াখালীতেও পুলিশ সাক্ষীদের হাজিরা নিশ্চিত করতে কড়াকড়ি করা হয়েছে। নোয়াখালীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জেলার বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে পাঠানো একটি চিঠিতে ১২১ জন পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বিচারাধীন মামলায় পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্য দেওয়ার দিন নির্ধারিত থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিত থাকছেন। এতে বিচারপ্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হচ্ছে। নির্ধারিত তারিখে অনুপস্থিত থাকা এবং যথাযথভাবে সাক্ষ্য না দেওয়া পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, কোনো পুলিশ সদস্য সাক্ষ্য দিতে অনুপস্থিত থাকলে তার ইউনিটকে বিষয়টি জানাতে হবে এবং অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবেদন প্রতি মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর কথাও উল্লেখ রয়েছে।

আগেও শত শত সাক্ষীকে চিঠি

সিএমপি সূত্র জানায়, পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে এর আগেও একাধিকবার দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারির একটি চিঠিতে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ৩৩ জন পুলিশ সদস্যকে আদালতে হাজির হতে অনুরোধ করা হয়। তাদের কেউ সিএমপির বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায়, আবার কেউ ঢাকা মহানগর পুলিশসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত ছিলেন।

এর আগে গত বছরের ১৯ নভেম্বরও এ ধরনের চিঠি পাঠানো হয়। গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টি দাপ্তরিক চিঠিতে তিন শতাধিক পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে বলে সিএমপি সূত্র জানায়।

জুলাইয়ের সময় কর্মরতরাও আছেন তালিকায়

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব পুলিশ সাক্ষীর একটি অংশ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ‘আওয়ামী লীগের ট্যাগের’ কারণে পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে বদলি হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যেও কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসছেন না। কেউ বা আসছেন ‘মবের’ ভয়ে।

ফলে একদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বা ঘটনাকালীন দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের বদলি, অন্যদিকে সমন পৌঁছানো ও আদালতে হাজিরার প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুর রাজ্জাক কালবেলাকে বলেন, সমন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়া, পুলিশ সদস্যের অবসর গ্রহণ কিংবা অন্য কারণে সাক্ষীরা আদালতে নাও আসতে পারেন। এতে মামলা জট বাড়তে থাকে।

তিনি বলেন, একবার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন শুনানি চালিয়ে যাওয়ার নিয়ম রয়েছে। বিচার দ্রুত করতে সরকার আইন সংশোধন ও নতুন আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সমন কার্যকর করার পাশাপাশি তাদের যাতায়াত খরচ ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ কালবেলাকে বলেন, এটা ওই রকম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়, এটা সাক্ষ্য দেওয়ার তাগিদ। অনেকে দূরে বদলি হওয়ার কারণে, অসুস্থতার কারণে, সমন ঠিকমতো না পাওয়ায় বা সমন না পৌঁছানোর কারণে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেন না। আবার কোনো কোনো সাক্ষী মারা গেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, পুলিশের সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর সমস্যা। একজন সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে বিচারপ্রার্থী ও রাষ্ট্র দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বদলি বা প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে তা সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আদালতের নির্দেশ ও পরোয়ানার পরও যদি সাক্ষী হাজির না হন, তাহলে এর দায় নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিচার দ্রুত করতে হলে শুধু নতুন আদালত নয়, সাক্ষ্যগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটিও কার্যকর করতে হবে।

 

  • সর্বশেষ