মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিস (তপশিল অফিস) ও উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি কার্যক্রম ঘিরে গড়ে উঠেছে দালালদের একটি চক্র। উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার জন্য যে আটটি তপশিল অফিস রয়েছে সেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছেন। এদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ খরচ না করলে নামজারিতে নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হয় সেবাপ্রার্থীদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ একটি নামজারি সম্পন্ন করতে সরকারি ফি বাদে সর্বনিম্ন ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। জটিল বা পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করলে ফাইল দ্রুত অগ্রসর হলেও সরাসরি আবেদনকারীরা নানা হয়রানির শিকার হন। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে প্রতিটি ফাইলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করলে নামজারির আবেদন নিষ্পত্তি হয় না।
জানা যায়, নামজারি, মিস মামলা ও ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে দালালরা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। দালালদের ফাইল শনাক্ত করার জন্য ফাইলের কোনায় বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করেন অফিসের কর্মচারীরা। তাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বুঝতে পারেন কোন ফাইল কার মাধ্যমে এসেছে। ফলে নির্দিষ্ট ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
ওয়াহেদপুর এলাকার বাসিন্দা আশরাফ নিজামী অভিযোগ করেন, ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির নামজারির জন্য আবেদন করলে তপশিল অফিস থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। কম টাকা দিতে চাওয়ায় তার আবেদনটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়নি। ফলে আবেদনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে তাকে নতুন করে আবেদন করতে হয়েছে।
অপর ভুক্তভোগী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার মেয়ের স্বামীর জমির নামজারির আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথমে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তা ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনেন। টাকা দিতে না পারায় আবেদনটিতে বিভিন্ন ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে তা নামঞ্জুর করা হয়।’
মিহির দাশ নামে এক আবেদনকারী জানান, ক্রয়কৃত জমির নামজারির জন্য আবেদন করার পর কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে। অনলাইনে নামঞ্জুরের তথ্য দেখালেও তাতে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। নেপাল নাথ অভিযোগ করেন, একই ধরনের দুটি আবেদনের মধ্যে তারটা নামজারি সম্পন্ন হলেও ভাইয়ের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তার দাবি, অর্থ লেনদেনের পার্থক্যের কারণেই এমনটি ঘটেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাগজপত্রে কোনো জটিলতা না থাকলেও ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে নামজারির প্রস্তাব পাঠাতে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। প্রস্তাব উপজেলা ভূমি অফিসে পৌঁছানোর পর চূড়ান্ত অনুমোদন ও খতিয়ান সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরও প্রায় তিন হাজার টাকা আদায় করা হয়। সরকারি ফি ১,১০০ টাকা হলেও বাস্তবে খরচ তার ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি।
ভুক্তভোগীরা জানান, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের পুরোনো দলিল, আদালতের রায় কিংবা একাধিক ওয়ারিশসম্পন্ন সম্পত্তির ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের কাছ থেকে বেশি অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তপশিল অফিস থেকে উপজেলা ভূমি অফিস পর্যন্ত এক ধরনের দরকষাকষির সংস্কৃতি চালু রয়েছে।
ওয়াহেদপুর তপশিল অফিসের তহসিলদার দিদারুল আলম অভিযোগ অস্বীকার করে সরাসরি অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন কাদের বলেন, ‘কেউ টাকা নেওয়ার বিষয়ে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে এক তহসিলদারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরএস খতিয়ান ও বিএস খতিয়ানের মধ্যে জমির হিস্যার অসংগতি থাকলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এসব বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে আবেদন যাচাই করা হয়।’ সূত্র: সমকাল