প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, মানুষের জয় হোক, সর্বমানবের সম্মিলিত সংগীত উৎসবে মুখরিত হোক পৃথিবী

 

স্বকৃত নোমান : দিল্লিতে যে সাম্প্রদায়িক রক্তপাত শুরু হয়েছে তার প্রভাব কি পশ্চিম বাংলায় কিংবা বাংলাদেশে পড়বে? হয়তো। কিন্তু আমরা আশাবাদী হতে চাই, পড়বে না। পড়তে আমরা দেবো না। এই ক্রান্তিকালে আমরা স্মরণ করতে পারি আমাদের অতীতকে। বাঙালি মানুষ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি বিশ শতকের কথা। ভুলে যায়নি বিশ শতকের ভয়াবহ দাঙ্গার কথা। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় যে নৃশংস হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিলো তা কুরুক্ষেত্রে হয়েছে কিনা সন্দেহ। কলকাতায় এক মুসলমানকে মেরে তার ছিন্নম-ু উল্লাসে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে হিন্দু মহাসভার দুই পা-। যবন হত্যা করেছে বলে তাদের আশীর্বাদ করছে এক ব্রাহ্মণ। বাচ্চাদের পা ধরে শূন্যে ঘুরিয়ে ছুড়ে দিচ্ছে মুসলিম লীগের পা-ারা। নোয়াখালীর চিত্ত রায় মুসলিম দাঙ্গাকারীদের বাধা দেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মাকে নিজ হাতে হত্যা করে তারপর আত্মহত্যা করেন। কী জঘন্য! কী ভীবৎস্য! দাঙ্গাটা আসলে অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো তখন। দাঙ্গার নেপথ্যে শুধু ধর্ম ছিলো না, শুধু ব্রিটিশের স্বার্থ ছিলো না, ছিলো দেশীয় কায়েমী স্বার্থ, ছিলো রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর আধিপত্য। হিন্দুরা মনে করেছিলো ‘বিজাতীয়’ মুসলিম স্পর্শে কলুষিত হয়েছে ভারতভূমি। এই ভূমির সম্মান রক্ষার্থে ব্রতী হতে হবে হিন্দুদের। মসজিদের সামনে বাজনা বাজাতে দেয়নি মুসলমানরা, তাতে হিন্দুরা মনে করেছিলো কোনো একদিন হয়তো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রাও। হিন্দুরা কি সহ্য করবে এই নিপীড়ন? হিন্দু মহাসভার এসব প্রচার স্বভাবতই স্পর্শ করেছিলো হিন্দুদের মন। বিশেষত বাংলায়, যেখানে তখন চলছিল মুসলিম লীগের শাসন, হিন্দুদের ধারণা হয়, এই ‘বিজাতীয়’ শাসনে নষ্ট হতে চলছে তাদের শিক্ষাদীক্ষা-ধর্ম-সংস্কৃতি। তাই ডাক দেয়া হয়, ‘হিন্দু জাগো, হিন্দুকে রক্ষা করো’। এই ডাকে উদ্দীপিত হয়ে হিন্দু যুবকরা নিজেদের সব্যসাচী অর্জুন ভাবতে শুরু করে এবং ভ্রাতৃহত্যা তাদের কাছে হয়ে ওঠে ধর্মের স্বার্থেই কর্তব্য।

অপরদিকে মুসলমানদের বোঝানো হয়েছিলো মুসলিম লীগের জয় মানে ইসলামের জয়, মুসলমানদের মুক্তি। লীগ ক্ষমতায় থাকলে জমিদারি উচ্ছেদ হবে, গ্রামে স্কুল হবে¯ এই প্রচার সাধারণ মুসলমান চাষিকেও উদ্দীপিত করেছিল। কারণ জন্মাবধি মুসলমানরা সহ্য করেছে হিন্দু জমিদারের অত্যাচার। আত্মগর্বী হিন্দু এক স্পর্ধিত উন্নাসিকতা নিয়ে ঘৃণা করেছিলো মুসলমান সমাজকে। তাই লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক যখন আসে, তার জবাব মুসলমানরা দেয় এক পাশব হিংসা প্রয়োগ করে। যে জাত নিয়ে হিন্দুদের এতো বড়াই, সে জাত নষ্ট করে দেওয়ার বাসনাই তখন প্রবল হয়ে উঠে মুসলমানদের মনে। তাই তারা একেকজন হয়ে ওঠে সুলতান মাহমুদ, বখতিয়ার খিলজি, আওরঙ্গজেব। সেই দাঙ্গার ইতিহাস বড় ভয়ানক, বড় কঠিন। এতো রক্ত, এতো লাশ। অমৃতসর থেকে লাহোর বা লাহোর থেকে অমৃতসর¯ কখনো কখনো পুরো একটা ট্রেনই এসছিলো মৃতদেহ বোঝাই হয়ে।

বিশ শতকের সেই ভয়াবহ দাঙ্গা জীবনানন্দকে যেভাবে রক্তাক্ত করেছিলো একইভাবে রক্তাক্ত করেছিলো প্রতিটি বাঙালি মানুষের হৃদয়। বাঙালি এখনো সেই রক্তস্মৃতি ভোলেনি, ভুলতে পারে না। নিশ্চয়ই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবো আমরা। ভারতবর্ষের এই ক্রান্তিকালে বড়ু চ-ীদাস আমদের আশ্রয়, লালন সাঁই আমাদের আশ্রয়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের আশ্রয়, নজরুল আমাদের আশ্রয়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের আশ্রয়, আউল-বাউল-পীর-ফকির-সন্ন্যাসী আমাদের আশ্রয়, লাখো-কোটি সংবেদী হিন্দু-মুসলমান আমাদের আশ্রয়। তাদের আশ্রয় করে আমরা ঠেকিয়ে দেবো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প।

ঠেকাতে ঠেকাতে উচ্চারণ করবো বড়ু চ-ীদাসের মন্ত্র : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা উচ্চারণ করবো লালন সাঁইর মন্ত্র : ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’। ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা স্মরণ নেবো রবীন্দ্রনাথের বাণীর : ‘উত্তরে হিমাচলের পাদমূল হতে দক্ষিণে তরঙ্গমুখর সমুদ্রকূল পর্যন্ত, নদীজালজড়িত পূর্বসীমান্ত হতে শৈলমালাবন্ধুর পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত চিত্তকে প্রসারিত করো। যে চাষি চাষ করিয়া এতোক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতোক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নমাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো।’ ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা উচ্চারণ করবো কাজী নজরুলের মন্ত্র : ‘মোরা এক বৃত্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/ মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’ ঠেকাতে ঠেকাতে উচ্চস্বরে ঘোষণা দেবো ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বাণী : ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালী।’ সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, মানুষের জয় হোক। সর্বমানবের সম্মিলিত সংগীত উৎসবে মুখরিত হোক পৃথিবী। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত