সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : অবশেষে কারামুক্তি পেয়েছে কক্সবাজারে মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত ‘রমজান আলীর’ বদলে কারাভোগ করা আয়নাবাজির শিকার ‘সোনা মিয়া'।
শুক্রবার সকাল ১১ টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তাকে কারামুক্তি দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান।
এর আগে, বৃহস্পতিবার ( ১৩ আগস্ট ) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুর রহিমের আদালত সোনা মিয়াকে ৪ টি শর্তে কারামুক্তির আদেশ দেন।
এদিকে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর সোনা মিয়াকে কাছে পেয়ে কারাগার প্রাঙ্গনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তার পরিবার ও স্বজনরা। এসময় স্ত্রী সন্তান ও মমতাময়ী মাকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে ভাসেন সোনা মিয়া। পরে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন স্বজনরা।
কারামুক্তি পাওয়ার জন্য সহযোগিতাকারী সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সোনা মিয়া । এসময় তিনি বলেন, কারাগারে প্রতিটি ক্ষণকে দিন আর প্রতিটি দিনকে প্রতি বছরের মতো কেটেছে তার।প্রশাসনের সুষ্ঠু তদন্ত থাকলে আজ তার এই পরিণতি হতো না বলেও আক্ষেপ জানান তিনি।
একজন নিরাপরাধ মানুষকে মিথ্যা ও সাজানো ঘটনায় আসামি করার তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে স্থানীরা বলেন, সোনা মিয়া একজন খেটে খাওয়া মানুষ, সে কখনো কোনো অপরাধের সাথে জড়িত ছিলো না। ঘটনার অন্যতম হোতা রমজান আলী মামলায় নিজেকে বাঁচাতে ‘আয়নাবাজির’ মত ঘটনা ঘটিয়েছে।
এদিকে ঘটনার পিছনে দেখা যায়, বিগত ২০২০ সালের ১ মার্চ রামু ও কক্সবাজার সদরে পৃথক অভিযানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ( ডিবি ) ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ ৫ জনকে আটক করে। পরদিন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মিজানুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের। এতে ঘটনাস্থল থেকে আটকের সময় পকেটে পাওয়া জন্মনিবন্ধন ও দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামীর নাম উল্লেখ করা হয় ‘সোনা মিয়া’।
বিগত ২০২২ সালের ১৩ জুন মাদক মামলায় কারান্তরীণ ‘সোনা মিয়া’ খ্যাত রমজান আলী কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরমধ্যে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর চলতি বছর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত ওই মামলায় ‘সোনা মিয়া সহ সংশ্লিষ্ট ৫ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫ এর একটি দল চকরিয়ার ডুলাহাজার থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানামূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। কিন্তু গ্রেপ্তার সোনা মিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পরই আসামিকে নিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন প্রশ্নের। আর এই প্রশ্নকে ঘিরে সামনে আসে ‘আয়নাবাজি’র মত চাঞ্চল্যকর গল্পের।
কারাগারে যাওয়ার ২/৩ দিন পর ‘সোনা মিয়া’ কারাগারের জেল সুপার বরাবর আবেদন করে দাবি করেন, তিনি এই মামলার আসামী নন। পরে জেল সুপার মামলায় ইতিপূর্বে জেল হাজত থেকে জামিনে বের হওয়া আসামী সোনা মিয়ার সঙ্গে বর্তমানে মৃত্যদণ্ডের সাজা নিয়ে কারান্তরীণ থাকা সোনা মিয়ার ছবি, ফিঙ্গার প্রিন্ট, ঠিকানা ও তথ্যের গড়মিল খুঁজে পান। এরপর জেল সুপার বিষয়টি জেলা ও দায়রা জজের লিখিতভাবে অবহিত করেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নিদের্শ দেন।
পরে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর আদালত সার্বিক বিষয়াদি বিবেচনার পর ৪ টি শর্তে সোনা মিয়াকে কারামুক্তির আদেশ দেন।
অবশেষে আয়নাবাজির মত সাজানো ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্তির দায়মুক্তি নিয়ে কারাগার থেকে ফিরে সোনা মিয়া নতুন করে জীবনযাপন করার স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যতে যেন সংশ্লিষ্টদের গাফেলতির শিকার হয়ে এইরকম নিরাপরাধ কাউকে কারাভোগ করতে না হয় সেই প্রত্যাশা সোনা মিয়া সহ সচেতন মহলের।