শিরোনাম
◈ বিশেষ সতর্কবার্তা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ◈ শিক্ষকদের অশ্রু মুছতে আজ ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী ◈ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কী কী পথ খোলা আছে? ◈ ভারতের স্বাধীনতা দিবসে মোদির ৬ বড় ঘোষণা ◈ বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে রিজভীসহ নতুন চার সদস্য ◈ বিগত বছরে গুম নির্যাতনের শিকার পরিবারকে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে: মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী ◈ হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু, পাঁচ মাসে প্রাণহানি ৯০২ ◈ ৫৩ বছর আগে পদ্মশ্রী পুরস্কা‌রের জন্য নির্বাচিত, বয়স ৮৮, এখ‌নো হাতে পাননি কিংবদন্তী ক্রিকেটার! ◈ অবসর ভাতার জন্য আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, অনলাইনেই ঘরে বসে টাকা পাবেন শিক্ষকরা: প্রধানমন্ত্রী ◈ মাদরাসার সিঁড়ির পাশে পড়ে থাকা ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৫ ছাত্রী

প্রকাশিত : ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:০৩ বিকাল
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কী কী পথ খোলা আছে?

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারের আপত্তির পরও দিল্লিতে শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর পাঁচ দিন পর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদি। বৈঠকের পর সেদিনই তিনি দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। পরদিন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাকে বৈঠক করতে দেখা যায়।

ঢাকায় বৈঠকের পর দিনেশ ত্রিবেদি ঠিক কী কারণে দিল্লি গিয়েছিলেন, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে হঠাৎ তৈরি হওয়া টানাপোড়েনের পেছনে দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনেরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই কি সত্যিই বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন? তিনি চাইলেই কি দেশে ফেরার সুযোগ পাবেন?

স্বেচ্ছায় ফিরবেন, নাকি প্রত্যর্পণের মাধ্যমে?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তার কোনো বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। বাংলাদেশ সরকার তার পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে পাসপোর্ট ছাড়া কীভাবে তিনি দেশে ফিরবেন, সেটি একটি প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

তবে এই দুটি বিষয়ই সরাসরি তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়—এমন নয়। মূল বিষয় হলো, শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন কি না এবং তিনি ফিরতে চাইলে বাংলাদেশ সরকার তাকে কীভাবে দেশে প্রবেশের সুযোগ দেবে।

বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা তাকে দেশে ফেরত চায়—এ অবস্থান স্পষ্ট।

তাহলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ কী?

এ ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।

প্রথমটি হলো, তিনি নিজ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারেন। বৈধ পাসপোর্ট থাকলে সেটি ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবেন। পাসপোর্ট না থাকলে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ট্রাভেল পারমিট বা ভ্রমণসংক্রান্ত অনুমতিপত্র নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নাগরিক। নিজ দেশে ফিরতে চাইলে সেটি তার অধিকার। বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে ট্রাভেল পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকার সেই আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনুমতি দেওয়া হলে তিনি ওই পারমিট নিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন।

অন্য পথটি হলো প্রত্যর্পণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত হয়ে অন্য দেশে অবস্থান করলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তাকে ফেরত চাওয়া যায়।

তবে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম ও আইনি সুযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ অনুরোধ করলেই ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানোর পরও দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় অদূর ভবিষ্যতে এ পথে তার ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

দেশে ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরছেন, তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা ফলপ্রসূ আলোচনা করে তিনি ফিরতে পারলে পরিস্থিতি এক রকম হতে পারে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।

আলোচনা বা সমঝোতা ছাড়া দেশে ফিরলে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হতে পারে অথবা গ্রেপ্তার হতে পারেন। কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালত ইতোমধ্যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং এরপর আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তার মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। ফলে দেশে ফেরার পর তাকে প্রথমেই হেফাজতে নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তাহলে দেশে ফেরার ঘোষণা কেন?

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি রয়েছে—এ বিষয়টি তিনি জানেন না, এমনটা মনে করার কারণ নেই। তারপরও দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাব থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। দলটির অনেক নেতা আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে রয়েছেন।

এ অবস্থায় দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে।

তবে তার বাস্তবে দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাঈদ ফেরদৌস।

তার মতে, শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, এরপর বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি আগের মতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে দেশে ফিরে এসে আত্মসমর্পণ করবেন—এমন সম্ভাবনা কম।

শেখ হাসিনা কি চাইলেই দেশে ফিরতে পারবেন?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা। তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণে বিষয়টি এককভাবে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে না বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর।

তার ভাষায়, বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিষয়ে অনেক সময় একাধিক পক্ষ ও অংশীজন যুক্ত হয়ে যায়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত এবং অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেখ হাসিনাকে কি দরকষাকষির হাতিয়ার করছে ভারত?

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, দিল্লি কি তাকে বাংলাদেশের সঙ্গে দরকষাকষির একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে?

এ বিষয়ে এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, ভারত যদি শেখ হাসিনার বিষয়টিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে নাও আনতে পারে।

তার মতে, দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ দেওয়া এবং এর পর বাংলাদেশ সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া—দুই দেশের সম্পর্কের সংবেদনশীলতা স্পষ্ট করেছে।

শেষ পর্যন্ত কী করবেন শেখ হাসিনা?

শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। তবে দেশে ফেরার ঘোষণা তার জন্য নতুন একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

একদিকে দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে না ফিরলে তার ঘোষণার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়া হয়ে থাকলে, শেষ পর্যন্ত তিনি না ফিরলে সেটি দলটির জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

তাই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত তিনি কোন পথ বেছে নেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়