শিরোনাম
◈ ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে কার শক্তি বাড়ল, কার কমল? : আলজাজিরার বিশ্লেষণ ◈ এশিয়া কাপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, আফগা‌নিস্তান ও মাল‌য়ে‌শিয়া ◈ আগামী বছ‌রের ১৮ মার্চ শুরু হচ্ছে পা‌কিস্তান সুপার লি‌গের দ্বাদশ আসর ◈ ৬ মাস নির্বাসনের মুখে ক্রিশ্চিয়া‌নো রোনাল্ডো, ক্ষমা চাইলে কমতে পারে শাস্তি ◈ ‌লিও‌নেল মেসির তিন ছেলেকে ঘিরে আর্জেন্টিনার নতুন স্বপ্ন ◈ এক জোনের অটোরিকশা চলবে না অন্য জোনে : আসছে নতুন নীতিমালা, কতটা কার্যকর হবে? ◈ ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে ১২০০ কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ, ‘ইকোনমিক হিটম্যান’ তকমা নিয়ে যা বললেন আশিক চৌধুরী ◈ অ্যাপস ভিত্তিক রাইড পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ গ্রাহকের তথ্য চুরির দাবি, মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ ডলার ◈ শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, ডিসেম্বরে চূড়ায় উঠতে পারে; প্রভাব থাকতে পারে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ◈ ‘বাবা, তারা আমাকে আটকে রেখেছে উদ্ধার করো, না হলে ওরা মেরে ফেলবে’—শেষ ফোনের কয়েক ঘণ্টা পর স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশিত : ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২৩ সকাল
আপডেট : ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২১ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণা থেকে বিশ্বজুড়ে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল টর

প্রযুক্তির দুনিয়ায় গোপনীয়তা আজ এক বড় প্রশ্ন। ইন্টারনেটের পথচলা শুরু হয়েছিল উন্মুক্ত আলোর বার্তা নিয়ে। কিন্তু সেখানেও লুকিয়ে আছে নজরদারির কালো ছায়া। সামরিক গবেষক আর হ্যাকারদের অদ্ভুত এক জোটের নাম টর (দ‍্য অনিয়ন রাউটিং) প্রজেক্ট। এই প্রকল্পই এখন বিশ্বজুড়ে রক্ষা করে চলেছে মানুষের ডিজিটাল স্বাধীনতা।

টর সাধারণত ডার্ক ওয়েব বা ডার্ক নেট হিসেবেও এখন পরিচিত। অপরাধের আখড়া হিসেবে পরিচিত হলেও এটি তৈরি করা হয়েছে  মার্কিন সরকারের অনুদানে। সহজ কথায় টর হলো বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল অবকাঠামো, যা অনলাইন পরিচয় গোপন রাখে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সার্ভারের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। টর প্রজেক্টের ওয়েবসাইট থেকে এই ব্রাউজার বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায়। ব্রাউজার ব্যবহারের সময় ইন্টারনেট সিগন্যাল এনক্রিপ্ট হয়ে বিশ্ব ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছায়। এর ফলে বিভন্ন সরকারের পক্ষে অনলাইন কার্যক্রম ট্র্যাক করা কঠিন হয়।

আজকের ডিজিটাল সমাজে ভিপিএন এবং এনক্রিপ্টেড মেসেঞ্জার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাইবার অপরাধ থেকে রক্ষা পেতে এই প্রযুক্তিগুলো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নজরদারি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় থাকায় সংঘাত লেগেই থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট রোধ করতে নানা আইন প্রণয়ন করছে। বিকৃত বা উগ্র কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক নীতির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, করপোরেট লোভ এবং উগ্র মানসিকতাও দায়ী।

টর নেটওয়ার্কের পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে গত ৩০ বছরে নানা ধরনের তথ্য জানা যায়। নব্বইয়ের দশকের বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের শুরুর সময়টি ছিল বেশ সম্ভাবনাময় ও সংঘাতপূর্ণ। সেই সময় সাইফারপাঙ্ক নামে পরিচিত হ্যাকার ও কম্পিউটারবিজ্ঞানীরা সামরিক এনক্রিপশন উন্মুক্ত করেন। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ইন্টারনেট স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করতে পারে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল এনক্রিপশন ইন্টারনেটের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। ইন্টারনেটের মূল স্থপতিরা এনক্রিপশনকে সিস্টেম সচল রাখতে জরুরি মনে করলেও নিজেদের বৈশ্বিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গোপনীয়তা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়।

Advertisement

মার্কিন সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে তখন ইন্টারনেট নিয়ে একচেটিয়া ধারণা কাজ করছিল। সীমানাহীন বাজারে অবাধ তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ধারণা বিজয়ী হবে বলে বিশ্বাস করা হতো। স্নায়ুযুদ্ধের অবসরের পর মার্কিন সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের পারদ ছিল শীর্ষে। এই বিশৃঙ্খল ও উচ্চ ঝুঁকির পরিবেশেই ডার্ক ওয়েবের প্রযুক্তির জন্ম হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি থেকে টরের যাত্রা শুরু হয়। টরের মূল ভিত্তি তৈরি হয় সাধারণ একটি কম্পিউটার ল্যাবে। ডেভিড গোল্ডশ্লাগ, মাইক রিড এবং পল সাইভারসন নামের তিন গবেষক কাজ শুরু করেন। বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের উত্থান সামরিক ব্যবহারকারীদের জন্য নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বার্তা সুরক্ষিত রাখতে এনক্রিপশন প্রযুক্তি আগেই তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কনটেন্টের বাইরে নেটওয়ার্কের নিজস্ব নিরাপত্তা সমস্যা রয়ে গিয়েছিল। ইন্টারনেটের ট্রাফিক রাউটিং সিস্টেমে মেটাডেটা ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা ছিল।

চিঠির খামের ওপর প্রাপক ও প্রেরকের ঠিকানা লেখার মতো মেটাডেটা কাজ করে। এই মেটাডেটা ইন্টারনেটের ডিজাইনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের পক্ষে এই তথ্য দেখা স্বাভাবিক বিষয়। রাউটিং ডিজাইন মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্র মূল পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহারকারীর ট্রাফিক নজরদারি করতে পারত। কিন্তু সিআইএ বা গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা বিদেশি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে আইএসপি তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সামরিক গবেষকেরা নতুন উপায় খুঁজতে শুরু করেন।

গবেষকেরা এমন একটি পথ খুঁজছিলেন, যা সামরিক বাহিনীকে গতির সুবিধা দেবে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্কের মেটাডেটা ঝুঁকি থেকে তাঁদের রক্ষা করবে। এখানেই অনিয়ন রাউটিং ধারণার জন্ম হয়। অনিয়ন রাউটিংয়ের মূলনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও মৌলিক বিষয় একই রয়েছে। ফলে ইন্টারনেটের রাউটিং তথ্য তিনটি স্তরের এনক্রিপশনে লুকিয়ে রাখা হয়। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন রাউটার বা রিলে সার্ভারের মাধ্যমে ট্রাফিক বাউন্স করানো হয়। প্রতিটি রিলে একটি করে এনক্রিপশন স্তর খুলে পরবর্তী সার্ভারের ঠিকানা প্রকাশ করে। শেষ সার্ভারটি গন্তব্য নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট ওয়েব সার্ভিসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এর ফলে কোনো সার্ভারের পক্ষেই উৎস ও গন্তব্য একসঙ্গে দেখা সম্ভব হয় না।

গোপনীয়তা রক্ষা করতে হলে টর নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে হতো। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই সাইফারপাঙ্ক এবং মার্কিন নৌবাহিনীর মধ্যে এক অদ্ভুত জোট গড়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচারের জন্য গবেষকেরা হ্যাকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নৌবাহিনীর গবেষকেরা ১৯৯৭ সালে ওকল্যান্ডের ইনফরমেশন হাইডিং কর্মশালায় অংশ নেন। সেখানে খাবার খাওয়ার সময় নামহীন সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। এর ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তার নতুন ধারণা জন্ম নেয়। তখন অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, হ্যাকার এবং সামরিক বাহিনী এক ছাতার নিচে চলে আসে। স্নায়ুযুদ্ধের পটভূমিতে হ্যাকার ও সামরিক বাহিনীর এই মেলবন্ধন এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দেয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সীমানা নতুন করে নির্ধারিত হয়।

কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এআই অবকাঠামোর যুগে টরের গুরুত্ব আরও বাড়ছে। সাইবার অপরাধ থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি এটি ভবিষ্যতের আশার আলো দেখায়। অনিরাপদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ট্রাস্ট বা আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই প্রযুক্তি সহায়ক। নিয়ন্ত্রণমূলক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখা জরুরি।

সূত্র: এমআইটি

  • সর্বশেষ