স্পোর্টস ডেস্ক : জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সমর্থনে গলা ফাটানোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বকাপের থেকেও টানটান। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ছে না। বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হালে পানি না পেলেও এই লড়াইয়ে এগিয়ে লিয়োনেল মেসির আর্জেন্টিনা। ২০৩০ সালে ৬৪ দেশের বিশ্বকাপ চায় আর্জেন্টিনা। তারা একটি বিবৃতিতে লিখেছে, “সভাপতির নেতৃত্বে গত ১০ বছর ধরে ফিফা যা করেছে, তাতে এই কমিটির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য গোটা বিশ্বে ফুটবলের উন্নতি। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে এই কাজ করছে তারা। --- আনন্দবাজার
আর্জেন্টিনা ছাড়াও আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ এই একই কথা বলছে। তারা প্রত্যেকে ইনফান্তিনোর প্রশংসা করেছে। অথচ কয়েক দিন আগে বিশ্বকাপটাই বেচে দিতে যাচ্ছিলেন ইনফান্তিনো। প্রবল বিরোধিতায় পিছিয়ে আসতে হয় তাঁকে। সেই বিরোধিতা মূলত হয়েছে উয়েফা থেকে। অবশ্য পিছিয়ে আসার জন্যও প্রশংসা পেয়েছেন ফিফা সভাপতি। কোনও সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য বোধহয় প্রথম বার কেউ এত প্রশংসা পেয়েছেন।
স্বচ্ছতা! যে স্বচ্ছতা না রাখার জন্য বার বার সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইনফান্তিনো, সেই স্বচ্ছতার কথা বলেই তাঁর প্রশংসা হচ্ছে। অদ্ভুত লাগছে না? না, এটাই ফুটবল। এখানে জেনেও অনেক সময় অন্য কথা বলতে হয়। যারা ইনফান্তিনোর প্রশংসা করছে তারা যতটা না সম্মান থেকে তা করছে, তার থেকেও বেশি ভয় থেকে। কিন্তু কেন এতটা ভয়?
গত ১০ দিনে ইনফান্তিনোর নানা কাজে বিশ্বফুটবল ও ফিফা সমস্যায় পড়েছে। কিন্তু তার পরেও তাঁর বিরোধিতা তো দূর, বিশ্বের একটা বড় অংশের ফুটবল সংস্থাগুলি তাঁকে সতর্ক পর্যন্ত করেনি। বদলে সমর্থন পেয়েছেন ইনফান্তিনো। আর এই সমর্থনের নেপথ্যে রয়েছে শর্ত। প্রতি পদে সামনে আসছে নানা শর্তের কথা।
বিশ্বকাপ বিক্রি নিয়ে বিরোধিতা শুরু হওয়ার পরেই মরক্কোয় জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন ইনফান্তিনো। কমিটির ৩৭ সদস্যের মধ্যে কয়েক জন বৈঠকে ছিলেন না। বাকিরা নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি আলোচনা করেন। এর পর তাঁরা জানান, ফিফা সভাপতির তরফে কোনও সমস্যা বা অস্বচ্ছতা ছিল না। তিনি শুধু সকলকে ঠিকমতো বোঝাতে পারেননি। পরে একটি বিবৃতিতে ফিফা বলেছিল, “সকলে রাজি হয়েছেন যে, ফিফার কাউন্সিল বা সদস্যদের না জানিয়ে কিছু করার চেষ্টা হয়নি। পুরোটাই প্রস্তাবের স্তরে ছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অথচ ইনফান্তিনো যে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ়’ তৈরি করে বিশ্বকাপের মালিকানা বিক্রি করার পরিকল্পনা প্রায় এক বছর ধরে করছেন, সেটা ফিফার কাউন্সিলের কেউ জানতেনই না। তা হলে কিসের স্বচ্ছতা? কিন্তু তার পরেও যে সব দেশ ইনফান্তিনোকে সমর্থন করেছে, তারা কোনও প্রশ্ন তোলেনি। কোনও সংশয় প্রকাশ করেনি।
সেই বিতর্কে মিটতে না মিটতে তৈরি হয়েছে আর এক নতুন বিতর্ক। জর্ডনের প্রিন্স তথা সেখানকার ফুটবল সংস্থার প্রধান আলি বিন আল হুসেন অভিযোগ করেছেন, ২০২৫ সালের আরব কাপের ফাইনালে ওঠার জন্য যে আর্থিক পুরস্কার তাঁদের পাওয়ার কথা ছিল, তা এখনও দেয়নি ফিফা। ২০১৬ সালে শেপ ব্লাটারের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে তাঁকে ফিফা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর এই আল হুসেনই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়েছিলেন। সেই কারণেই কি এই পদক্ষেপ?
আল হুসেন আরও অভিযোগ করেছেন, জর্ডন ফুটবল সংস্থাকে নাকি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, আগামী বছর নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে সমর্থন করতে হবে। তা হলেই বকেয়া টাকা পাওয়া যাবে। এ তো সরাসরি ব্ল্যাকমেল! ফিফা এই অভিযোগের জবাব দেয়নি। অবশ্য কয়েক দিন পরেই ফিফা জর্ডনের বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিয়েছে। তার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন আল হুসেন। তবে তিনি এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ফিফা সভাপতির একনায়কতন্ত্র নিয়ে তাঁদের যে মনোভাব ও চিন্তা তার বদল হবে না।
কিন্তু তার পরেও ফিফা সভাপতির তাপ-উত্তাপ নেই কেন?
উত্তরটা সহজ। ইনফান্তিনোর মাথাব্যথার কোনও কারণই নেই। ফিফা সভাপতির বিরোধিতা করলে যে নানা রকমের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে তা জলের মতো পরিষ্কার। সেই কারণেই তো ফিফাকে সেই রাজসভার মতো লাগছে, যেখানে সকলকে রাজার ভয়ে থাকতে হয়। প্রশংসা করে বা ঘুষ দিয়ে রাজার নেকনজরে থাকতে হয়। নইলেই গর্দান যায়। এ তো চলতে পারে না।
ফুটবলের বিস্তার হয়েছে। বিশ্বের ২১১ দেশ ফিফার সদস্য। টাকাও এসেছে। সঙ্গে এসেছে ক্ষমতা। কিন্তু সেই ক্ষমতা যদি এক জনের হাতেই কুক্ষিগত থাকে, তা হলেই শুরু হয় সমস্যা। বাড়ে সংশয়। বিরোধিতা প্রয়োজন। হাত বদল প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে সেই সমস্যাই দেখা গিয়েছে।
একার হাতে ক্ষমতা থাকলে তার প্রভাব কী হতে পারে, তা গত এক বছরে দেখেছে বিশ্বফুটবল। খেলাটার ধাঁচাই বদলে দিয়েছেন ইনফান্তিনো। হাইড্রেশন ব্রেক এসেছে। বহু ফুটবলার এই নিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
পাশাপাশি ফুটবলে ঢুকে পড়েছে রাজনীতি। ফিফা নিজস্ব শান্তি পুরস্কার দেওয়া শুরু করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেলেও ফিফার শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। বিশ্বকাপে বার বার হস্তক্ষেপ করেছে হোয়াইট হাউস। ইরান, সেনেগালের মতো দেশগুলিকে নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে।
দেখে মনে হচ্ছিল, ফিফা নয়, ট্রাম্প চালাচ্ছেন বিশ্বকাপ। নইলে তাঁর এক ফোনে আমেরিকার ফুটবলার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের সাসপেনশন তুলে নেয় ফিফা। আর সে সব তো লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি। হয়েছে প্রকাশ্যে। সকলের সামনে।
এর পরেও কি ইনফান্তিনো শাসন চালিয়ে যাবেন?
ফুটবল বহরে যত বাড়ছে, তত বাড়ছে সমস্যা। ফিফার মতো সংস্থা কি এক জনের অহঙ্কার, ইচ্ছা, ব্যক্তিগত মতের উপর চলতে পারে? সেখানে কি বদলের প্রয়োজন নেই?
আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কী ভাবে সেই বদল সম্ভব? ইনফান্তিনো নিজেই সেই পথ দেখিয়েছেন। ১০ বছর আগে তিনি উয়েফার দায়িত্ব সামলাতেন। তাঁকে দেখে সকলে ভেবেছিলেন, ব্লাটারের দুর্নীতির জবাব হতে পারেন ইনফান্তিনো। তাই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ১০ বছর পর তো তিনি দুর্নীতিতে ব্লাটারকে কয়েক যোজন পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছেন। এ বার আবার কোনও মুখ খুঁজতে হবে বিরোধীদের। যিনি ইনফান্তিনোর জবাব হতে পারেন।