ইফতেখার আলম বিশাল : বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাদের বৈঠককে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। একের পর এক অভিযোগ, দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই এবার রাজশাহী মহানগর বিএনপির অধীন রাজপাড়া থানা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র ও রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজানের করা অভিযোগ থেকে জানা যায়, গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাদের বৈঠকের পর থেকেই স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধের সূত্রপাত। ওই বৈঠক ও পরবর্তী সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজানের দূরত্ব তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিজানের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর বিরোধ তীব্র হয়। একপর্যায়ে তিনি দলের কাছে বিষয়টির বিচার ও সাংগঠনিক সমাধান চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি—এমন দাবি করে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।
অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান মিজান দাবি করেন, গত ১৪ আগস্ট রাত ১০টার দিকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে কাশিয়াডাঙ্গা থানা বিএনপির সভাপতি মাইনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী তাঁকে খুঁজতে যান। তাঁর অভিযোগ, ওই সময় তাঁদের কয়েকজনকে মদ্যপ অবস্থায় দেখা যায়। ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজও রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনার বিচার চেয়ে মহানগর বিএনপির কাছে আবেদন করার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ রাজপাড়া থানা বিএনপির কার্যক্রম স্থগিতের কয়েক দিন আগেই মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরে অভিযোগ নিষ্পত্তি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
এর মধ্যেই শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাজশাহীর ভুবন মোহন পার্কে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রস্তুতি সভায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, সভায় মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের বক্তব্য চলাকালে রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান আগের একটি ঘটনার বিচার দাবি করেন। রিটন তাঁকে সভা শেষে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন।
কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির সমাধানের দাবিতে মিজানুর রহমান মিজান ও রাজপাড়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামের সঙ্গে মহানগর নেতাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয় বলে সভায় উপস্থিত নেতারা জানান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে তাঁরা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন—এমন অভিযোগও করেন উপস্থিত নেতারা।
পরে রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বসে বিষয়টি মীমাংসার জন্য বলা হলেও তাঁরা সভাস্থল ত্যাগ করেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। ঘটনাটিকে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণ হিসেবে উল্লেখ করে রাজপাড়া থানা বিএনপির কার্যক্রম স্থগিতের প্রস্তাব দেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন। এরপর মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. মামুন অর রশিদ মামুন ওই কমিটির কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করেন।
প্রশ্ন উঠছে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে
রাজশাহী মহানগর বিএনপির এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দলীয় পর্যায়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে, নাকি অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে এক পক্ষের অভিযোগ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
দলটির একাধিক নেতার ভাষ্য, ব্যক্তিগত বিরোধ বা সাংগঠনিক মতপার্থক্যকে সময়মতো আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি না করা হলে তা দ্রুত গ্রুপিংয়ে রূপ নিতে পারে। আর গ্রুপিং তৈরি হলে একই দলের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
রাজশাহী বিএনপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক এলাকায় এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। কারণ মহানগরের সাতটি থানা এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে যদি নেতৃত্ব নিয়ে বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে দলের সমন্বয়, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন সাংগঠনিক ঐক্য ও শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত না হওয়া এবং এক পক্ষের বিরুদ্ধে আরেক পক্ষের প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া দলের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান তাঁর অভিযোগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ফলে বিষয়টি এখন কেবল রাজশাহী মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; দলীয় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
দলীয় রাজনীতিতে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের বিচার যদি স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় না হয়, তাহলে ক্ষোভ কেন্দ্রের দিকে গড়ানোর ঝুঁকি থাকে। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে একই ইউনিটের নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পৌঁছালে তা স্থানীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ অবস্থায় রাজশাহী মহানগর বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্যক্তি বা গ্রুপ নয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
কারণ, একটি থানা কমিটি স্থগিত করা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে; কিন্তু বিরোধের মূল কারণ অমীমাংসিত থাকলে তা অন্য ইউনিটেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. মামুন অর রশিদ মামুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান বলেন, দলীয় কার্যালয়ে রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকের আগে একটি তালিকা প্রণয়নকে কেন্দ্র করে কাশিয়াডাঙ্গা থানা বিএনপির সভাপতি মাইনুল ইসলাম তার সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। অথচ ওই তালিকা তিনি তৈরি করেননি।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৪ আগস্ট রাতে মাইনুলের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে খুঁজতে দলীয় কার্যালয়ে যান। এসব ঘটনায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অভিযোগ করলেও বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং কোনো ধরনের নিরপেক্ষ তদন্ত বা তাদের বক্তব্য না নিয়েই রাজপাড়া থানা বিএনপির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
মিজান বলেন, ‘আমরা দলের শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে কোনো সাংগঠনিক ইউনিটের বিরুদ্ধে একপাক্ষিকভাবে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা উচিত। বিষয়টি দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নজরে এনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’
এ ব্যাপারে রাজপাড়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, ২৮ আগস্টের প্রস্তুতি সভায় কাশিয়াডাঙ্গা থানা বিএনপির সভাপতি মাইনুল ইসলামকে মঞ্চে বসানোয় তারা বিব্রত হন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না করে এবং বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া অবস্থায় তাকে সামনের সারিতে বসানোয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এ কারণে তারা সভাস্থল ত্যাগ করেন। পরে জানতে পারেন, তাদের সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তারা এখনো কোনো লিখিত আদেশ পাননি।
জানতে চাইলে কাশিয়াডাঙ্গা থানা বিএনপির সভাপতি মাইনুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
এদিকে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।