শিরোনাম
◈ ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্র হতে না দেওয়াই ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ ৪০ কোটি টাকা না দিলে দলে থাকবেন না! আইপিএলের তারকাদের অবিশ্বাস্য দাবি ◈ যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে ইরানের ৭ শর্ত: বাকেরি ◈ বগুড়ায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ছিনতাই, আটক ৪ নারী ◈ ঢাকায় এক রাতে ৮ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বৈশাখী পরিবহনের বাসে আগুন ◈ যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসায় সরকারি সহায়তা নিলেই ভবিষ্যতে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি: মার্কিন দূতাবাস ◈ মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ঘিরে ভারত কেন আলোচনায়?  ◈ শেষ হচ্ছে পিসিবির এনওসি নাটক! লিগের সঙ্গে করছে সমঝোতা! ◈ রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার আশা, কতটা বদলাবে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে? ◈ টেকনাফে ৫৬ জিম্মি উদ্ধার, বেরিয়ে এলো পাচারচক্রের ভয়ংকর তথ্য

প্রকাশিত : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৩ দুপুর
আপডেট : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৩ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৭ নভেম্বরই সামরিক কর্মকর্তা জিয়াকে রাজনীতিবিদ জিয়াউর রহমান করে তুলেছিল

শাহাজাদা এমরান: বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সামরিক সংগঠক মেজর জিয়াউর রহমান এবং ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর—দুটি নামই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে যেমন জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে ৭ নভেম্বরকে সামনে আনতেই হয়। কারণ, এই দিনটি তাঁকে সেনানিবাসের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবির্ভূত হওয়ার পথ খুলে দিয়েছিল।

একজন সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠার পেছনে ৭ নভেম্বর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ না ঘটলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের পরবর্তী অবস্থান কোন পথে এগোত, তা নিয়ে ইতিহাসে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পেশাগত দক্ষতা ও সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে একপর্যায়ে মেজর পদে উন্নীত হন। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়।

Advertisement

সেই ভয়াল রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দেশের মানুষ তখন চরম অনিশ্চয়তা ও দিশাহীনতার মধ্যে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান  বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা তখনকার বিপর্যস্ত মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দেয়। 

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সামরিক ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় জেড ফোর্স, যা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেডগুলোর একটি। সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আবার সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ফিরে যান। 

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে নানা পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে একের পর এক রাজনৈতিক ও সামরিক পটপরিবর্তন শুরু হয়। ২৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়। একই সময়ে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। দেশ তখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। 

এরপর আসে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত, অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর। সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সৈনিকদের একটি দল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। তাঁকে সেনানিবাসে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরদিন তিনি পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে সৈনিকদের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের অংশগ্রহণও ছিল। ঢাকার রাজপথে সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। 

এখানেই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। ১৯৭১ সালে যিনি সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই তিনিই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে তিনি শুধু সেনাপ্রধানের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ধীরে ধীরে রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় রাজনীতির প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই একজন সামরিক কর্মকর্তা থেকে তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সক্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার সময় কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলো তাঁর সরকারের নীতিতে গুরুত্ব পায়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান জোরালো করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা এগিয়ে নিতে তিনি সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকারের আমলে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। 

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিণতি, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। যে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা  করেছিলেন, সেই চট্টগ্রামেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি গভীর শূন্যতা তৈরি করে। একজন সৎ, দেশপ্রেমিক ও আদর্শবান রাজনীতিককে হারিয়ে গোটা জাতি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের দিকে ফিরে তাকালে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে জাতীয় পরিচিতি দিয়েছিল একজন সাহসী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে। আর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাঁকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে আসার সুযোগ করে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে  জাতীয়  বিপ্লব ও সংহতি দিবস আবার  কেউ সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান-পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য—এই দিনটি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্থান এবং বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।দেশ এক দলীয় শাসন থেকে বহু দলীয় গণতন্ত্রে  প্রবেশ করেছিল। 

ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিনেরই একাধিক পাঠ থাকে। ৭ নভেম্বরও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বুঝতে হলে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে জানতে হবে। কারণ, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের ঘোষণা তাঁকে পরিচিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে, আর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাঁকে পরিচিত করেছিল রাজনীতির জিয়াউর রহমান হিসেবে।

এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবন থেকে রাজনৈতিক জীবনে উত্তরণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।

লেখক : সম্পাদক,দৈনিক কুমিল্লার জমিন, 01711388308

  • সর্বশেষ