শিরোনাম
◈ মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ঘিরে ভারত কেন আলোচনায়?  ◈ শেষ হচ্ছে পিসিবির এনওসি নাটক! লিগের সঙ্গে করছে সমঝোতা! ◈ রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার আশা, কতটা বদলাবে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে? ◈ টেকনাফে ৫৬ জিম্মি উদ্ধার, বেরিয়ে এলো পাচারচক্রের ভয়ংকর তথ্য ◈ ঢাকায় দুই রুটে মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা, চলছে নকশার কাজ ◈ কপ-৩১ সম্মেলনে যোগ দিতে ১০ নভেম্বর তুরস্ক যাচ্ছেন তারেক রহমান, সফরে গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয় ◈ উজানের পানিপ্রবাহ বন্ধ, অপরিকল্পিত সেতু ও খননে মৃতপ্রায় ভৈরব নদ; বাঁচাতে পদ্মার সঙ্গে পুনঃসংযোগের দাবি ◈ ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু, ৩ হাজার ৯৮১ ইউনিয়নের তালিকা যাচাইয়ের নির্দেশ ইসির; তফসিল ১০ ডিসেম্বর ◈ যে ৫১ অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারবেন মালয়েশিয়াগামী কর্মীরা, ফি সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা ◈ নরসিংদীতে স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের দিয়ে পর্ন ভিডিও তৈরি করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পর্নসাইটে বিক্রির অভিযোগ!

প্রকাশিত : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৫ দুপুর
আপডেট : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৫ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ঘিরে ভারত কেন আলোচনায়? 

ডেস্ক রি‌পোর্ট: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মাসের শেষ সপ্তাহে টোকিও সফরে গিয়েছিলেন, সেখানে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন করে উঠে এসেছে জাপানের বিগ-বি প্রকল্প। সফরে জাপান এবং বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ এই প্রকল্প নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। যেটাকে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে বিগ-বি ফর শেয়ারড প্রসপ্যারিটি বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি উদ্যোগ।

কিন্তু এই বিগ-বিকে ঘিরে দুটো বিষয় নিয়ে বিশেষ আলোচনা হচ্ছে। একটি হচ্ছে, যৌথ ঘোষণায় কানেক্টিভিটির প্রসঙ্গ।আরেকটি হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের উল্লেখ এবং এর গুরুত্ব স্বীকার করে নেওয়া। ----- বি‌বি‌সি বাংলা

বিশেষত কানেক্টিভিটির নামে ভারতকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। দেশটির প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ঢাকায় এক জনসভায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও সরকার জানাচ্ছে, এ ধরনের কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু বিগ-বি উদ্যোগকে ঘিরে বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে আসলে কী হচ্ছে?

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা থেকে যেভাবে গভীর সমুদ্রবন্দর

Advertisement

মাতারবাড়ি হচ্ছে বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী কক্সবাজার জেলার একটি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে বাংলাদেশ-জাপান প্রথমে একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেটাও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আমলে। সেই সময় চুক্তি হওয়ার পর এর কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে।

সরাসরি সমুদ্রের তীরে না করে সমুদ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার ভেতরে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ শুরু হয়। যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লাভিত্তিক ফলে কেন্দ্রে কয়লা আনা-নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয় নৌ-চ্যানেল।

সমুদ্রের তীর থেকে মাটি কেটে সার্বক্ষণিক কয়লা পরিবহনের জন্য ২৫০ মিটার চওড়া এবং ১৪ কিলোমিটার লম্বা চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়। তবে ২০১৭ সালে জাইকা যে প্রাক-সমীক্ষা করে, সেখানে নতুন আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে আসে সংস্থাটি। ঐ সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চ্যানেলের সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে চ্যানেলের দক্ষিণ দিকে বাণিজ্যিক বন্দর স্থাপন করা সম্ভব।

প্রস্তাব করা হয়, যেই চ্যানেলটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে সেই চ্যানেলের ওপরই একটি বাণিজ্যিক বন্দর হতে পারে। একই চ্যানেল ব্যবহার করে দুটি প্রকল্পের কার্যক্রম করা হলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার যেমন হবে, তেমনই ব্যয় সাশ্রয়ী হবে।

পরবতীকালে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলাদেশ। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র শেষপর্যন্ত গিয়ে ঠেকে গভীর সমুদ্র বন্দরে। চ্যানেলের গভীরতা এবং প্রশস্ততাও বাড়ানো হয়। আর এখন সেই গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ও রফতানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ।

এখন মাতারবাড়িতে বিগ-বি'র আওতায় কী হচ্ছে?

বিগ-বি'র পূর্ণ নাম হচ্ছে 'বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ। এটি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে ঘিরে জাপানের একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা। জাপান মাতারবাড়ীতে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এ কারণে গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহের জন্য সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে দেশটি।

এর আওতায় সেখানে ইতোমধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়েছে। আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রও স্থাপন হচ্ছে। এরপর হবে এলএনজি টার্মিনাল, হবে গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল। বিগ বি নিয়ে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণায় মূলত চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এক. ঐ অঞ্চলে কানেক্টিভিটি তৈরি করা, যার মূল ভিত্তি হবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর।

দুই. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো।

তিন. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, যার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ছয় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জাপানি বিনিয়োগ আসবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

চার. শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পাবে বাংলাদেশ। জানতে চাইলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিবিসি বাংলাকে বলেন, তারা মূলত বাংলাদেশকে একটি রফতানি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চান।

তিনি বলেন, "মাতার বাড়িতে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে গভীর সমুদ্র বন্দর এবং তাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, লজিস্টিকস, তারপরে অর্থনৈতিক এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। এখানে আমরা কিন্তু পরিকল্পিত নগরও গড়ছি, যাতে করে এটা একটা গ্লোবাল রফতানির কেন্দ্র হতে পারে। আমরা চেষ্টা করব সেটাকে পূর্ব এশিয়ার দেশ হোক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হোক, ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে কিংবা আফ্রিকা -সব জায়গায় এটাকে নিয়ে যেতে।

ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে

বৈশ্বিক রফতানির কেন্দ্র হওয়ার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, শিল্পকলকারখানা, সমুদ্রবন্দর এবং যোগাযোগব্যবস্থাসহ যা যা অবকাঠামো দরকার, তার সবই করা হচ্ছে মাতারবাড়িতে। এর জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ দরকার, সেটাও দেবে মূলত জাপান।

কিন্তু এর ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, জাপানের আগ্রহ বিশেষত মাতারবাড়িকে ঘিরে যে বিপুল বিনিয়োগ, তাতে বাংলাদেশ শেষপর্যন্ত কতটা লাভববান হবে?

বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই প্রকল্পে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে বাংলাদেশের।

বলা হচ্ছে যে এখানে প্রায় ষাট থেকে পঁয়ষট্টি বিলিয়ন ডলারের একটা বিনিয়োগ হবে এবং এই বিনিয়োগের মধ্যে আটচল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারই বেসরকারি বিনিয়োগ হবে। যেই বিনিয়োগগুলো মূলত জাপানিজ বিনিয়োগকারীরা নিয়ে আসবে। বলেন গোলাম মোয়াজ্জেম। তার মতে, জাপানি বিনিয়োগের পথ ধরেই উন্নতি হবে অর্থনীতিতে।

জাপানের মত বড় বিনিয়োগকারীরা যদি তাদের বিনিয়োগ নিয়ে আসেন তাহলে একই সাথে তো শুধু তার পণ্য আসবে না। এখানে একই সাথে তাদের একটা প্রযুক্তিও আসবে। তখন সেটা আমাদের লোকাল বিনিনিয়োগকেও আরো বেশি উৎসাহিত করবে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যাওয়ার। কারণ এগুলোর সঙ্গে যে সাপ্লাই চেইনগুলো গড়ে উঠবে, সেই সাপ্লাই চেইনগুলো তখন এখানে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। বলা হচ্ছে, এর ফলে প্রায় আটাশ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে সেই জায়গা জুড়ে। এটা ঘটবে কয়েক দশক ধরে।

ভারত নিয়ে সংশয় কেন?

বাংলাদেশে মাতারবাড়ি প্রকল্পের চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৪ সালে। চুক্তিটি হয়েছিলো জাপানের সঙ্গে।

তখন প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে মিলিয়ে একটি বৃহৎ বাজারের ধারণাকে মাথায় রেখে এই পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এসেছিল জাপান। ২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দেশটির তখনকার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে 'বিগ-বি' ধারণাটি প্রথমে সামনে নিয়ে এসেছিলেন।

শিনজো আবে বিগ-বি ধারণাটি সামনে আনার পর ২০১৪ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে এই ধারণাটির আনুষ্ঠানিক একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তখনকার জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা'র প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা।

তিনি বলেছিলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়টি এই ধারণার মূল ভিত্তি। আর এর দ্বিতীয় ভিত্তি হবে জ্বালানি এবং তৃতীয়টি হলো পরিবহন ব্যবস্থা।

অর্থাৎ গভীর সমুদ্র বন্দরটির মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যের একটি বৈশ্বিক হাব হবে মাতারবাড়ী এবং সেখানকার বিদ্যুৎ দিয়েই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। আর পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত।

পরে শেখ হাসিনা ঢাকায় মাতারবাড়ীকে নিয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বিশেষ পরিকল্পনা হিসেবেও গৃহীত হয়েছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই শিল্পাঞ্চলের প্রস্তাব উঠে আসে। অর্থাৎ বিগ-বি উদ্যোগ এবং একে ঘিরে মাতারবাড়ি প্রকল্পে সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ছিলো ভারত।

কিন্তু এখন ২০২৬ সালে যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি, তখন বিগ-বি উদ্যোগ নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত হয়েছে জাপান-বাংলাদেশ দুই দেশই। অর্থাৎ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা আরো জোরদার হয়েছে। যদিও তারেক রহমানের জাপান সফরে যে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিগ-বি নিয়ে সরাসরি ভারত বা অন্য কোন দেশের নাম উল্লেখ নেই।

কিন্তু ঘোষণায় কানেক্টিভিটি প্রসঙ্গ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে মাতারবাড়িকে গড়ে তোলার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটাতেই স্পষ্ট এই প্রকল্প শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। এবং এখানে প্রতিবেশি দেশগুলো বিশেষত ভারত প্রাসঙ্গিক।

ফলে এই প্রকল্পে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ভারতকে সুবিধা দেওয়া হবে, এমন সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। আর এই সন্দেহ দেখা যাচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, যেখানে ভারত সবসময়ই একটি স্পর্শকারতর ইস্যু।

গত ৩১শে অক্টোবর ঢাকায় এক সমাবেশে ভারতের নাম উল্লেখ না করেই মাতারবাড়ি প্রকল্পে কৌশলে ভারতকে কানেক্টিভিটি দেয়া হচ্ছে কিনা- সেই প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে।

মাতারবাড়ি গভীর বন্দর নিয়ে কোনো লোকচুরি হচ্ছে কিনা, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারো কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।" হুশিয়ারি দেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মাতারবাড়িতে কানেক্টিভিটি নিয়ে জামায়াতের যে উদ্বেগ, সেটা ঠিক কী কারণে? এ বিষয়ে বিবিসির পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানতে চাইলে দলটির পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবিসিকে জানান, জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা বা যেসব অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে, সেগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে তারা পরে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করবেন।

তবে বিস্তারিত না জানলেও জামায়াতসহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল যে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট তাদের উদ্বেগ মূলত এই প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততা বিশেষকরে এর মাধ্যমে ভারত করিডোর বা ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা পাচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে।

জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বিবিসিকে বলেন, বিগ-বি'র অর্থনৈতিক মডেল চমৎকার। তবে এখানে ভারতের মতো দেশকেও যদি সুবিধা দিতে হয়, তাহলে সেটা করার আগে বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য লাগবে।

তিনি বলেন, "আমাদেরকে বলা হচ্ছে ইন্ডিয়ার সাথে কানেক্টিভিটি করে আমরা একটা একত্রিত বা একিভূত মার্কেট তৈরি করতে পারি কিনা। এই অর্থনৈতিক চিন্তা ভালো চিন্তা। কিন্তু এই চিন্তার আগে যে রাজনৈতিক যে ঐকমত্য লাগে, সেই রাজনৈতিক ঐকমত্য হয় নাই। আমি মনে করি আগে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করতে হবে।

ভূ-রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন

সমস্যা শুধু ভারতকে নিয়ে নয়। একইসঙ্গে চীন এই বিগ-বি প্রকল্পকে কীভাবে দেখবে, সেই প্রসঙ্গও উঠছে। কারণ বিগ-বির দ্বৈত ঘোষণায় জাপান বলেছে মুক্ত, স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা। এই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগ। যেটাকে চীন দেখে থাকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাকে ঘিরে ফেলার মার্কিন চেষ্টা হিসেবে। জাপান হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে বিবিসিকে বলেছেন, জাপান বিগ-বি ধারণায় ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ধাপে ধাপে আঞ্চলিক আরও দেশগুলোর সাথে বিগ-বির বিষয়টি সামনে আসতে পারে।

তিনি বলেন, এখানে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় আছে। কারণ জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরেই কাজ করছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটিকে বড় শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে রেখে জাপানি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা।

এছাড়া বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে জাপান দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এমন ধারণাও আছে। ফলে এমন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, বাংলাদেশকে মূল ফোকাস দিতে হবে অর্থনীতিতে।

তিনি বলেন, "পার্টিকুলারলি আমাদের জন্য চাইনিজ বিনিয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একইসঙ্গে কৌশলগতভাবে চায়নার সম্পর্কটাও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইভাবে আমরা আঞ্চলিক পার্টনার হিসেবে ভারতের সঙ্গে যে একটা বড় বাজার রয়েছে সেটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখার দরকার আছে। সুতরাং এই জায়গাটিতে দুটো সম্পর্ককে পাশাপাশি রেখে কোন জোটেই খুব বড়ভাবে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত না হয়ে কীভাবে বাংলাদেশ তার ইকোনমিক মাইলেজ (অর্থনৈতিক সুবিধা) নিতে পারে সেরকম কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।"

একইরকম মত দেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী। তিনি বলেন, "বাংলাদেশকে জাপানের সাথেও থাকতে হবে। আমেরিকার সাথেও থাকতে হবে। একই সঙ্গে চায়নার সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এটা বলা যতটা সহজ করা ততটা সহজ না। কিন্তু আমার মনে হয় এইটাই হচ্ছে পথ। কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে কী করবে? জানতে চাইলে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ভারসাম্যের কথা।

"সকল দেশের সাথেই আমরা বিনিয়োগে উৎসাহী এবং সেভাবেই কিন্তু সব হচ্ছে। যেমন ইতিমধ্যেই চীন থেকে চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দরে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ হচ্ছে। একই সঙ্গে যদি আমরা চট্টগ্রামের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখব সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ আছে, ঠিক একই সাথে ইউরোপের দেশও আছে।তিনি যোগ করেন মাতারবাড়ি সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে।

এটা সকলের জন্যেই কিন্তু অবারিত যে আমাদের সাথে তারা প্রস্তাব দিতে পারে এবং প্রস্তাবের যৌক্তিক ভিত্তি বিবেচনা করে, বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তারপর তাদের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা হবে।

  • সর্বশেষ