শিরোনাম
◈ জাপানে তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি সফর : বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে জোরদার ◈ প‌্যা‌রি‌সে বিক্ষোভের উত্তাপ, সোমবার রাতে পিএসজির ম্যাচ ◈ ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় ইউরোপ, কতটা নিরাপদ মুসলিমরা? : আল-জাজিরার বিশ্লেষণ ◈ বাস-ট্রেনে হেডফোন ছাড়া গান শুনলে ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে কোন দেশে কত জরিমানা? ◈ প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের: শামা ওবায়েদ ◈ বলপ্রয়োগ করলে ফ্যাসিবাদী, না করলে দুর্বল ভাবে মানুষ: আইজিপি ◈ মাদরাসায় বলাৎকার: কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার ◈ কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে ১০০ কোটি ডলারের নয়, ১০ কোটি ডলারে ক্যান কারখানা গড়ছে চীনা প্রতিষ্ঠান ◈ গাজীপুরে সুপ্রিম গার্মেন্টসের কার্টন গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৮ ইউনিট ◈ যে কারণে বাতিল হতে পারে মার্কিন ভিসা, জানাল দূতাবাস

প্রকাশিত : ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫৫ বিকাল
আপডেট : ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১৪ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি : আলামত ভালো ঠেকছে না

শাহাজাদা এমরান : শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে রাজধানীর মগবাজারে বিশাল সেন্টারের সামনে পার্ক করে রাখা দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও কুমিল্লার কৃতী সন্তান আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ঘটে এ ঘটনা। তবে গুলির সময় গাড়িতে ছিলেন না আসিফ আকবর। ফলে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মগবাজারে আসিফ আকবরের একটি ব্যক্তিগত কার্যালয় রয়েছে। সেই কার্যালয়ের কাছেই বিশাল সেন্টারের সামনে গাড়িটি পার্ক করা ছিল। ভোরের দিকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করছে পুলিশ। তবে কারা, কী কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে গুলিবর্ষণের ঘটনা হলেও এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, আসিফ আকবর কেবল একজন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নন; তিনি কুমিল্লার সন্তান, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে প্রকাশ্য রাজধানীতে গুলি চালানোর ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমার কাছে এই ঘটনার আলামত ভালো ঠেকছে না। তবে এই আশঙ্কার পেছনে কী বাস্তবতা রয়েছে, তা জানতে হলে আবেগের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

সংগীতজগতে ‘যুবরাজ’ হিসেবে পরিচিত আসিফ আকবরের রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান সম্পর্কে দেশের মানুষের কমবেশি ধারণা রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি সমর্থন এবং প্রকাশ্যে নিজের মতামত তুলে ধরার প্রবণতা তাঁকে অন্য অনেক শিল্পীর চেয়ে
স্বতন্ত্র করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে তিনি রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে নানা
প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ কিংবা নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের
কথা বলতে তিনি পিছপা হননি। যখন অনেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধা করতেন, তখন আসিফ আকবর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মতামত তুলে ধরেছেন। আমি তাঁকে একজন জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ হিসেবেই দেখি। তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক হলো, তিনি নিজের বিবেচনায় সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজের ক্ষতি হতে পারে জেনেও সরাসরি কথা বলার প্রবণতা তাঁর মধ্যে রয়েছে। কারও কাছে এই স্পষ্টবাদিতা প্রশংসনীয়, কারও কাছে তা অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ কখনোই কারও ওপর সশস্ত্র হামলার অজুহাত হতে পারে না।
আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনাটি নিয়ে আমার মনে অন্তত দুটি সম্ভাবনার কথা আসছে।
প্রথমত, কোনো পক্ষ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

Advertisement

বিশেষ করে সামনে ডিসেম্বর মাস কেন্দ্র করে যখন আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন এ ধরনের ঘটনা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত, পেশাগত কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁর সঙ্গে কারও বিরোধ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। সেই বিরোধ থেকেও হামলার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত আশঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এর পেছনে দেশীয় কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা বৃহত্তর আন্তজার্তিক কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এসব সম্ভাবনার পক্ষে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অনুমানকে সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও সমীচীন নয়। তদন্তে সব দিক সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাজধানীর মগবাজারের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একজন পরিচিত ব্যক্তির গাড়ি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা কীভাবে গুলি চালিয়ে পালিয়ে গেল? ঘটনাটি যদি পরিকল্পিত হয়ে থাকে, তাহলে হামলাকারীরা কীভাবে সেখানে এল, কতক্ষণ অবস্থান করল, কীভাবে পালিয়ে গেল এবং তাদের সহযোগী কেউ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, উদ্ধার করা আলামত এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা সম্ভব।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনা শুধু একজন শিল্পী কিংবা তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে। একজন পরিচিত ব্যক্তির গাড়ি যদি এভাবে গুলির লক্ষ্যবস্তু হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, ঘটনাটিকে কোনো সাধারণ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে দায়সারা তদন্তে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। বরং দ্রুত ও পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে হামলার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনাকারী এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি তুলে ধরার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। তবে
তাড়াহুড়ো করে কাউকে দায়ী করা নয়; প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত
করা এবং তাঁদের আইনের আওতায় আনা।

একই সঙ্গে আসিফ আকবর ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তিনি জনপ্রিয় শিল্পী বলে বাড়তি সুবিধা পাবেন—এমন দাবি নয়; বরং একজন নাগরিক হিসেবে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ যে পক্ষেরই হোক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার সবার জন্য সমান। আমি মনে করি, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শুধু আসিফ আকবরের জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থেও জরুরি। যদি এটি ব্যক্তিগত বিরোধের জের হয়, তবে সেই সত্য প্রকাশ করতে হবে। আর যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হামলাটি চালানো হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনের পরিকল্পনাকারীদেরও চিহ্নিত করতে হবে। অপরাধের প্রকৃত কারণ আড়াল করে শুধু কয়েকজন প্রত্যক্ষ হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্তের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

সবশেষে বলতে চাই, রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। মতের সঙ্গে মতের বিরোধ থাকবে, সমালোচনা হবে, যুক্তি-তর্ক হবে। কিন্তু সেই বিরোধের নিষ্পত্তি কখনো গুলি কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে হতে পারে না। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কাউকে নীরব করার চেষ্টা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার জন্যই বিপজ্জনক।

আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনাটি তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। মানুষ জানতে চায়, কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে এবং এর পেছনে কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে কি না। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো, অনুমান ও গুজবের অবসান ঘটিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য জাতির সামনে তুলে ধরা।

আলামত ভালো ঠেকছে না—এই আশঙ্কার অবসান ঘটানোর একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। সত্য উদ্‌ঘাটিত হোক, অপরাধী যে-ই হোক বিচারের মুখোমুখি হোক—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সম্পাদক,দৈনিক কুমিল্লার জমিন ও সাধারণ সম্পাদক, নাগরিক অধিকার ফোরাম,কুমিল্লা।
01711388308।

  • সর্বশেষ