চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ীদের খুশি করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভ্যাট রিটার্ন জমায় পরিবর্তন আনে। প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান করা হয়। এতে মাঠপর্যায়ে ভ্যাট আদায়ে নেমে আসে বিপর্যয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি নামে মাইনাস ২৬ শতাংশে। এতে টনক নড়ে এনবিআরের। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বসেন এনবিআর কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে একটি কার্যপত্র তৈরির নির্দেশ দেন উপদেষ্টা। এতে প্রতি মাসে ভ্যাটের রিটার্ন জমার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। ভ্যাট আদায়ের এ বিপর্যয় টেকাতে আগের আইনে ফিরছে এনবিআর। তিন মাসের পরিবর্তে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা আসছে। এরই মধ্যে বিষয়টির সারসংক্ষেপ তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এনবিআর। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের পর আইনের পরিবর্তন করতে এনবিআরের এ প্রস্তাব সংসদে উঠবে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা সহজের নামে ভ্যাট রিটার্ন প্রতি মাসের বদলে তিন মাস পরপর করার প্রস্তাব করে এনবিআর। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির এ প্রস্তাব সংসদে পাসও হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ভ্যাট আহরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হতে পারে, তার কোনো সমীক্ষা ছাড়াই ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন এ প্রস্তাব করা হয় সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের নির্দেশনায়। বাজেটের পর বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে জটিলতা তৈরি হয়। আর প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা না থাকায় ভ্যাট আদায়ও কমে যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় ভ্যাট আহরণ। আলোচ্য সময়ে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। আর আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম মাসেই ভ্যাট আদায় লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকে নেমে আসে। এতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।
আর প্রবৃদ্ধি হিসেবে গত একযুগে রেকর্ড ঘাটতি দাঁড়ায় মাইনাস ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এতেই টনক নড়ে এনবিআরের। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এনবিআরের নতুন প্রশাসন। পরবর্তী সময়ে এনবিআর চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বৈঠকে সমস্যাটি তুলে ধরেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা ভ্যাট রিটার্ন জমার বিষয়টি নিয়ে ওয়ার্কিং পেপার তৈরির নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের ভ্যাট পলিসির কর্মকর্তা একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করে দেন। আর এনবিআরের প্রস্তাবের যৌক্তিকতার বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। ভ্যাট রিটার্ন ফের আগের আইনে করার জন্য একটি সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছে এনবিআর। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানিয়েছে এনবিআর সূত্র।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ভ্যাট রিটার্ন জমাসংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আসছে। এ-সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন শেষে প্রস্তাবটি সংসদে উঠতে পারে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, হুট করে কেনইবা তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা চালু করা হলো। আবার তিন মাস না হতেই কেনইবা আগের আইনে ফিরে যাওয়া হচ্ছে। মূলত বিষয়টি হলো অ্যাডহক নিয়ম চালু করা। দেশের একটা জাতীয় পলিসি তো এভাবে হতে পারে না। ভ্যাটের রিটার্ন-সংক্রান্ত নিয়ম চালু এবং বাতিল করার আগে বিষয়টি পর্যালোচনা করা জরুরি ছিল। উদাহরণ হিসেবে এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, হাড় শেক দিয়ে যেমন চলা যায় না, তেমনি হুটহাট নিয়ম পরিবর্তন করলে সমস্যা তৈরি হয়। তাই নতুন কোনো পলিসি চালুর ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত যেসব সমস্যা তৈরি হতে পারে, তা আগেই পর্যালোচনা করা উচিত।
মাঠপর্যায়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভ্যাট অফিসগুলোর জন্য বাজেটের এ নতুন পদ্ধতি প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি করেছে। সাধারণত ভ্যাট অফিসগুলোতে প্রতি মাসে দাখিলপত্র যাচাই-বাছাই করে ফাঁকি রোধে কাজ করে। তিন মাসের ডাটা যখন একসঙ্গে ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলোয় জমা পড়বে, তখন এত বেশি ট্রানজেকশন অডিট করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে কর্মকর্তাদের জন্য। এ ছাড়া ভ্যাট বকেয়া পড়ার হার বাড়লে এনবিআরকে তা আদায়ের জন্য ঘন ঘন কারণ দর্শানোর নোটিশ, ডিমান্ড নোটিশ এবং সার্টিফিকেট মামলা করতে হবে।
এতে রাজস্ব বিভাগের প্রশাসনিক ব্যয় এবং মামলার জট দুই-ই বাড়তে পারে। নতুন নিয়মের কারণে আরেকটি বড় জটিলতা হলো—ভোক্তা পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারকে টাকা দিয়ে দিলেন, অথচ সরকার সেই টাকা নিজের কোষাগারে না এনে তিন মাসের জন্য একজন মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীর কাছে বিনাসুদে গচ্ছিত রাখার সুযোগ তৈরি করে দিল। আর তিন মাস ধরে সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের হাতে আটকে থাকলে সরকার সেই অর্থের সময়মূল্য থেকে বঞ্চিত হবে। অনেক সময় সরকারকে তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হতে পারে, যাতে জনগণের ওপর বাড়তি ঋণের বোঝা চাপবে বলেও মনে করেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের ভ্যাট পলিসির সাবেক সদস্য ও বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরামের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রউফ কালবেলাকে বলেন, তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্নের সিদ্ধান্তটি অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব নীতি সাদা চোখে বা সরলভাবে দেখলে প্রকৃত চিত্র দেখা যায় না। ভ্যাট দাখিলপত্র ১ মাসের স্থলে ৩ মাস অন্তর দাখিল করা হলে ব্যবসাবান্ধব হবে, এটা ছিল এমনই এক অতিসরলীকরণ। এ সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের কী পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, তা অক্টোবর মাসে বোঝা যাবে বলেও জানান সাবেক এ কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, যেক্ষেত্রে দাখিলপত্রের সঙ্গে রাজস্বের সংশ্লিষ্টতা নেই, সেক্ষেত্রে দাখিলপত্র দাখিল করার মেয়াদ বাড়ালে তা ব্যবসাবান্ধব হয়। কিন্তু ঠিকাদার, জোগানদার এবং সিঅ্যান্ডএফ সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট দাখিলপত্র দাখিলের মেয়াদ ছিল ৬ মাস।
কারণ, এসব ক্ষেত্রে দাখিলপত্রের সঙ্গে রাজস্বের সংশ্লিষ্টতা নেই। অজ্ঞাত কারণে সেটা এবার বাতিল করা হয়েছে। আবার যেসব ক্ষেত্রে দাখিলপত্রের সঙ্গে রাজস্বের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ১ মাসের স্থলে ৩ মাস করা হয়েছে। এ দুটি সিদ্ধান্তই ভুল হয়েছে। যার কারণে রাজস্ব আদায় এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি তৈরি করার প্রয়োজনে এ দুটি সিদ্ধান্ত সংশোধন করা প্রয়োজন বলেও জানান ভ্যাট নীতির সাবেক এ এনবিআর সদস্য। উৎস: কালবেলা।