প্রিন্ট বিশ্লেষণ: ঢাকা চায় দিল্লি যেন ‘প্রতীকী সৌহার্দ্য’-এর বাইরে যায়। ঢাকার ভাবনা হলো, যেকোনো নতুন উদ্যোগ দিল্লি থেকেই আসতে হবে, সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের মাধ্যমে।দ্যপ্রিন্ট জানতে পেরেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিগগিরই ভারতে কোনো দ্বিপাক্ষিক সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম এবং আগামী মাসে নির্ধারিত ব্রিকস নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনও তিনি এড়িয়ে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকার একটি রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, “আগামী মাসগুলোতে কোনো দ্বিপাক্ষিক সফরের পরিকল্পনা নেই, যদি না ভারতের সৌহার্দ্য প্রতীকী পদক্ষেপের বাইরে যায়।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নয়াদিল্লিতে তার সংবাদ সম্মেলন ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের মধ্যেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্ক চায়, কিন্তু তারা মনে করে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে নয়াদিল্লিকে একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। কিছু সূত্র এমনকি এও বলেছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর বাংলাদেশের জনগণকে এই বার্তা দিতে পারে যে, ভারত সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে আন্তরিকভাবে আগ্রহী।
ঢাকার এক রাজনৈতিক সূত্র দ্যপ্রিন্টকে বলেন, ‘এখন যেকোনো উদ্যোগ ভারতের পক্ষ থেকেই নিতে হবে, সম্ভবত মোদির ঢাকা সফরের মাধ্যমে। দিল্লি যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে প্রস্তুত না থাকে, তবে দ্বিপাক্ষিক সফরের কোনো সম্ভাবনা নেই।’
সূত্রগুলো জোর দিয়ে বলেছে যে, রহমান সরকার কোনো ভারত-বিরোধী নীতি অনুসরণ করছে না এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। তবে তারা বলেছে, নতুন সরকারকে বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করতে দেখা যাবে না।
আরেকটি সূত্র বলেছে, ‘ইউনুসের পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসনের মতো এই সরকারের বার্তা ভারত-বিরোধী নয়। সরকার ভারত-বিরোধী বাগাড়ম্বরেও লিপ্ত হয়নি। তবুও ভারতের মনোভাব আগের সরকারের আমলের মতোই রয়ে গেছে।’
সূত্রগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরুদ্ধারে ভারতের বিলম্বের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। যদিও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রহমানের সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল, জুন মাসের শেষ পর্যন্ত পর্যটন ভিসা স্থগিত ছিল। সূত্রগুলো জানিয়েছে, যখন ভিসা পুনরায় চালু করা হয়, তখন সেগুলো আগের দীর্ঘমেয়াদী ভিসা ব্যবস্থার অধীনে ইস্যু করা হয়নি।
ঢাকার জন্য, বিষয়টি সরকার-থেকে-সরকার সম্পর্কের পাশাপাশি ক্রমশ জনমত সম্পর্কিত হয়ে উঠছে। একটি সূত্র জানায়, ‘বিএনপি-এর চেয়ে জনগণই বেশি মনে করে যে, ভারত কেবল কথার কথা বলছে এবং বাংলাদেশ ২.০-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আন্তরিক নয়।’
সূত্রগুলো আরও জানায়, রহমান এই মনোভাবের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন বলে পরিচিত হতে চাইবেন না। তারা যুক্তি দেখান যে, তার সমর্থকরা তাকে ‘জনতার প্রধানমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করেন এবং তিনি প্রতিদানমূলক কোনো পদক্ষেপ ছাড়া নয়াদিল্লির কাছে নতি স্বীকার করছেন বলে দেখাতে পারেন না।
বাধা
দুই দেশের মধ্যকার এই বিরোধের মূলে রয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি দেশে ছাত্র অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট ২০২৪-এ ভারতে পালিয়ে যান।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকার হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে ভারতকে বারবার অনুরোধ করেছে। তার ক্রমাগত জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং বিবৃতি ঢাকার বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে হাসিনার উপস্থিতির পর, যেখানে তিনি একটি সমাবেশে ভাষণ দেন এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন যে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এবং বলেন যে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে তার প্রত্যাবর্তন দেশের নাগরিকদের প্রতি একটি “কর্তব্য” হবে।
ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে যে, হাসিনাকে ভারতীয় মাটি থেকে এ ধরনের মন্তব্য করার অনুমতি দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে গভীরভাবে আঘাত করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ সরকারও হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। তারা ভারতকে অন্যান্য পলাতক আসামিদের পাশাপাশি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ‘বিপ্লবী’ ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সন্দেহভাজনদেরও হস্তান্তর করতে বলেছে। তিনি শেখ হাসিনার একজন কট্টর সমালোচক ছিলেন।
সফর পরিকল্পনা স্থগিত
দ্যপ্রিন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় কর্মকর্তারা সফরের জন্য ২১ ও ২২ আগস্ট তারিখ প্রস্তাব করেছিলেন, অন্যদিকে ঢাকা তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের কথা মাথায় রেখে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকটাকেই বেশি পছন্দ করেছিল। তবে, নয়াদিল্লিতে হাসিনার সর্বশেষ জনসমক্ষে উপস্থিতির আগেই এই তারিখগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
আগামী ২০ আগস্ট বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং ২৭ আগস্ট সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। ভারত বঙ্গোপসাগরীয় বহু-খাতভিত্তিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমস্টেক)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে রহমানকে আগামী মাসে ব্রিকস নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
কিন্তু ঢাকা একটি স্বতন্ত্র দ্বিপাক্ষিক সফর পছন্দ করে, যা তাদের মতে, একটি বহুপাক্ষিক সম্মেলনের বাইরে আলোচনা সীমাবদ্ধ না রেখে উভয় পক্ষকে আরও বিস্তৃত বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ দেবে।যেহেতু অদূর ভবিষ্যতে রহমানের ভারতে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন কম, তাই প্রশ্ন হলো, এই বর্তমান অচলাবস্থা কীভাবে ভাঙা যেতে পারে।
ঢাকার চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশের অবস্থান হলো, হাসিনার আমলে বিদ্যমান চরম একপেশে সম্পর্কের পরিবর্তে, রহমান সরকারের ভাষায় “পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌম সমতা এবং পারস্পরিক সুবিধা”-র ভিত্তিতে সম্পর্কটি পুনর্গঠন করতে হবে।
সুতরাং, ঢাকার বার্তাটি এমন নয় যে বাংলাদেশ ভারত থেকে দূরত্ব তৈরি করতে চায়, বরং তারা চায় নয়াদিল্লি যেন স্বীকার করে যে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। (সংক্ষেপিত)