বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ সংশোধন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যা ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজ অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তিনি বলেন, ‘যে দেশে একসময় টেলিকম আইনের নিবর্তনমূলক ধারার অপব্যবহার করে বেআইনি নজরদারি চালানো হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, এবং যার পরিণতিতে অসংখ্য গুম ও প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে- সেই দেশে টেলিযোগাযোগ আইনের এমন মানবিক, দায়িত্বশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সংশোধন নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
ফাইজ তাইয়েব আহমেদের ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধরা হলো-
নতুন যাত্রা: ইন্টারনেট বন্ধ নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ আইনে ঐতিহাসিক সংশোধন
পর্বতসম দৃঢ়তা, অটল সংকল্প, অবিচল নিষ্ঠা এবং সর্বোচ্চ অঙ্গীকারের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ আইনে এক মৌলিক সংস্কার সম্পন্ন করেছে। এই সংশোধন কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়- এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর এক সাহসী পদক্ষেপ।
আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে-
১। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা: পূর্ববর্তী আইনে হেইট স্পিচকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। সংশোধিত আইনে সেটি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। এখন কেবল তখনই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যখন বক্তব্যের সাথে সহিংসতা উসকে দেওয়ার সরাসরি সম্পর্ক থাকবে। নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সমুন্নত রাখাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।
২। নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা প্রায় শতভাগ পুনর্বহাল: মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ঘনঘন প্রদত্ত লাইসেন্স, পারমিট, এনলিস্টমেন্ট, ট্যারিফ পরিবর্তন, মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্টসহ অধিকাংশ কার্যকরী ক্ষমতা পুনরায় বিটিআরসি-র নিকট ন্যস্ত করা হয়েছে।
শুধুমাত্র জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘ওয়ান্স ইন এ টাইম’ লাইসেন্সের ক্ষেত্রে- স্বাধীন ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া যৌথ গবেষণার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার শর্ত রাখা হয়েছে।
৩। বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর এই খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সকল জরিমানা এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত বিনিয়োগকারীদের ডিউ-ডিলিজেন্স ও ফিজিবিলিটি মূল্যায়নে আর নেতিবাচক সংকেত দেবে না।
৪। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ: মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি’র কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কোয়াসি-জুডিশিয়াল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ পোস্ট-ফ্যাক্টো রিভিউ করবে।
৫। সংসদীয় জবাবদিহি: নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটির নিকট নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে।
৬। ইন্টারনেট বন্ধ নিষিদ্ধ: এ আইনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক দিক- বাংলাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করার ক্ষমতা আইনি কাঠামো থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। নাগরিকদের অধিকার ও সংযোগ, অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল অর্থনীতির ধারাবাহিকতা এখন আইনি সুরক্ষা পেয়েছে।
৭। আন্তর্জাতিক মানের আইনসম্মত নজরদারি ব্যবস্থা: পূর্ববর্তী অস্বচ্ছ ও নিকৃষ্ট নজরদারি কাঠামোর পরিবর্তে (আর্টিকেল ৯৭ সংশোধন) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত ল’ফুল ইন্টারসেপশন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে।
নজরদারিকে ‘জরুরি’ ও ‘অ-জরুরি’- এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রি-অ্যাপ্রুভাল ও পোস্ট-ফ্যাক্টো রিভিউ, কেস-বাই-কেস স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর, সময়সীমা নির্ধারণ, ইভেন্ট লগিং, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল- এই সবকিছু স্পষ্টভাবে কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
যে দেশে এক সময় টেলিকম আইনের নিবর্তনমূলক ধারার অপব্যবহার করে বেআইনি নজরদারি চালানো হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, এবং যার পরিণতিতে অসংখ্য গুম ও প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে- সেই দেশে টেলিযোগাযোগ আইনের এমন মানবিক, দায়িত্বশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সংশোধন নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই মৌলিক সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে। এটি শুধু একটি আইনি পরিবর্তন নয়- এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সাহসী পদক্ষেপ। এই মৌলিক সংস্কার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।
প্রফেসর ড মুহাম্মদ ইউনূস, আপনাকে অভিনন্দন। অভিনন্দন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর টপ ম্যানেজমেন্টকে, যারা আন্তরিক সহযোগিতা না করলে এ মাইলফলক অর্জন সম্ভব হতো না।