ডেস্ক রিপোর্ট: নিজের পকেটের টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশের ৩২ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়ের মুখে পড়েছেন, ২০০৫ সালে যা ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট (এইচইইউ) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সুইডিশ দূতাবাসের সহায়তায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল ঢাকার একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থায়নে চিকিৎসাব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। ---- সূত্র, ডেইলি স্টার
গবেষণায় দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর একটি পরিবারের চিকিৎসায় গড় মাসিক নিজস্ব ব্যয় ২০০৫ সালের ১ হাজার ২৪১ টাকা থেকে বেড়ে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৩৮ টাকায়। এ সময়ে চিকিৎসায় নিজস্ব অর্থ ব্যয় করা পরিবারের হার ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
ওষুধ, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসকের পরামর্শ ফি স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় উৎস। বহির্বিভাগের চিকিৎসায় ফার্মেসির ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষণায় আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভিত্তিতে দরিদ্রতম ২০ শতাংশ মানুষের ৯০ দশমিক ৮ শতাংশকে চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়তে দেখা গেছে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে এ হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। ২০২২ সালে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ আর্থিক সংকটে পড়েছেন, শহরাঞ্চলে এ হার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে বরিশালে। ২০০৫ সালে বিভাগটিতে চিকিৎসাব্যয়জনিত আর্থিক সংকটের হার ছিল সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ১ শতাংশে, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
সরকারি হাসপাতাল এখনো ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় প্রধান ভূমিকা রাখলেও এ ক্ষেত্রে তাদের অংশ কমেছে। ২০১৬ সালে ভর্তি রোগীদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতেন। ২০২২ সালে এ হার কমে হয়েছে ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ের সুবিধা বণ্টনে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আগের প্রবণতা দুর্বল হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, এমন জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি সম্পদ যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসাব্যয়জনিত আর্থিক সংকট কমাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, দরিদ্রবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বিনা মূল্যে ও নির্ভরযোগ্যভাবে সরবরাহের সুপারিশ করেছে গবেষণা দল। দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসাও সাশ্রয়ী ও ধারাবাহিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতের বেহাল অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে গবেষণার ফলাফলে। চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি গভীর উদ্বেগের বলে উল্লেখ করে তিনি স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অঙ্গীকারের কথা জানান।
অনুষ্ঠানে গবেষণার পৃথক উপস্থাপনা দেন ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের তৌহিদুল ইসলাম ও সায়েম আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক এনামুল হক।