মনিরুল ইসলাম: দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর মাসে ১৫ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মাছের দাম। অন্যদিকে গত দুই মাসে (সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর) নিত্যপণ্যের দাম সম্মিলিতভাবে বেড়েছে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।
আজ রোববার ৮ নভেম্বর প্রকাশিত কনজুমারস ফোরাম (সিএফ)-এর এক বাজার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সংগঠনটির সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের সংগৃহীত বাজার তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে মাছের দাম বেড়েছে গড়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ। মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি ও জিরার দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম ৬ দশমিক ০২ শতাংশ, চিনির দাম ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ভোজ্যতেল ও ডালডার দাম ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, আটা-ময়দার দাম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং চালের দাম গড়ে ২ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়েছে।
অক্টোবরে ডিমের দামও বেড়েছে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। পাশাপাশি মাংসের দাম ০ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং চায়ের দাম ০ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাত পণ্যের দাম স্থিতিশীল, কমেছে দুইটির
সিএফের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অক্টোবর মাসে সাত ধরনের পণ্যের দাম স্থিতিশীল ছিল। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে লবণ, দুগ্ধজাত পণ্য, ব্রাশ ও টুথপেস্ট, চানাচুর-বিস্কুট, নিত্যব্যবহৃত ১১টি ব্র্যান্ডের ওষুধ এবং খাতা-কলম।
অন্যদিকে দুই ধরনের পণ্যের দাম কমেছে। এর মধ্যে শাকসবজির দাম কমেছে ৩ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সোনা-রূপার দাম কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
উৎপাদন এলাকায় কম দামে বিক্রি, ঢাকায় কয়েক গুণ বেশি
প্রতিবেদনে শীতকালীন শাকসবজির বাজার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যশোর, বগুড়া ও রংপুর এলাকার বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। তবে উৎপাদনকারীরা বলছেন, উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না তাঁরা।
বগুড়া ও রংপুরে প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৬ থেকে ১২ টাকা, মুলা ৬ থেকে ৮ টাকা, প্রতিটি লাউ ৮ থেকে ১০ টাকা এবং কাঁচকলার হালি ৫ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অথচ একই পণ্য ঢাকার বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীতে প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৫০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, মুলা ৩০ টাকা, লাউ ৬০ টাকা এবং কাঁচকলার হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উৎপাদনকারী পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে পণ্যের দামের এই বড় ব্যবধান বাজার ব্যবস্থাপনা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
দুই মাসে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৭.৫২ শতাংশ
সিএফের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছিল ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। অক্টোবর মাসে আরও বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, দুই মাসে নিত্যপণ্যের দাম সম্মিলিতভাবে বেড়েছে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, এভাবে পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
শুধু বেতন বাড়ালেই চলবে না, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে জীবনযাত্রার ব্যয়
ভোক্তা সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু বেতন-ভাতা বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি শহর ও নগরে বাড়ি ও দোকানভাড়া, শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা ব্যয়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য খরচও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সিএফ আশা প্রকাশ করেছে, সরকার গ্রাম পর্যায়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য সহনীয় রাখতে কার্যকর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। পাশাপাশি বাজার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে পণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।