যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে পোশাক আমদানি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ সময়ে দেশটির মোট পোশাক আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিও কমেছে, তবে পতনের হার তুলনামূলক কম; ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রধান দুই প্রতিযোগী চীন ও ভারতের রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ ও ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
ফলে সংকুচিত মার্কিন বাজারে চীন-ভারতের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে রপ্তানির পরিমাণের পাশাপাশি পণ্যের গড় মূল্য কমে যাওয়ায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাজারের এ পরিবর্তনে বাড়তি ক্রয়াদেশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পণ্যের বৈচিত্র্য, গুণগত মান ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ সময়ে আমদানি করা পোশাকের পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ পোশাকের পরিমাণ কমলেও তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য আমদানির প্রবণতা দেখা গেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। আমদানির পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। সামগ্রিক মার্কিন বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার কম হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে কিছুটা উদ্বেগের চিত্রও রয়েছে। আগস্টে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছিল; কিন্তু সেপ্টেম্বরে আবার ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর আবার আমদানি কমেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
প্রতিযোগীদের তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান মূল্যায়ন করতে গেলে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর রপ্তানি পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ভারতের ক্ষেত্রে এ পতনের হার আরও বেশি, ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। পাকিস্তানের রপ্তানিও কমেছে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে কম্বোডিয়া থেকে আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে কমেছে ২ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে চীন ও ভারতের বড় ধরনের পতনের বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও ভারতের রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং পণ্যের গুণগত মান, বৈচিত্র্য, উৎপাদন সক্ষমতা ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বাজার হিস্যা ধরে রাখলেও কমছে পণ্যের দাম
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো থাকলেও পণ্যের গড় মূল্য কমে যাওয়াকে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশে। অর্থাৎ বাজার হিস্যায় সামান্য পরিবর্তন হলেও বড় ধরনের পতন হয়নি। তবে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানির গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য বিশ্ববাজারের গড়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। এশিয়ার সাতটি প্রধান সরবরাহকারী দেশের মধ্যে পাঁচটির পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে। এর মধ্যে চীনের গড় ইউনিট মূল্য কমার হার সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তাদের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কম দামে পোশাক রপ্তানি করে বাজার ধরে রাখার প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। অথচ পণ্যের বিক্রয়মূল্য না বাড়লে কারখানার মুনাফা কমে যাবে। এতে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল আমাদের সময়কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক আমদানি কমার হার কম হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক। তবে পণ্যের গড় ইউনিট মূল্য কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। কম দামে পণ্য রপ্তানি করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না।
কারণ উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের ও বেশি মূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় পতন বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে পোশাক সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এ জন্য প্রচলিত টি-শার্ট, ট্রাউজার ও সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি স্পোর্টসওয়্যার, আউটডোর পোশাক, সিনথেটিক ও ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পণ্য এবং ফ্যাশননির্ভর উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির বাজার সংকুচিত হলেও চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক। তবে রপ্তানির পরিমাণের পাশাপাশি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাজার হিস্যা ধরে রাখার পাশাপাশি রপ্তানি আয়, মূল্য সংযোজন ও মুনাফা বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে এ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।