পার্থিব জীবনের সমাপ্তি মানেই হিসাব-নিকাশের খাতা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও তার রেখে যাওয়া কিছু কর্মের ধারা এমন থাকে, যার কারণে কবরে শুয়েও তাকে পাপের বোঝা বইতে হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মৃতদের জীবিত করি এবং তারা যা আগে পাঠিয়েছে এবং তাদের রেখে যাওয়া প্রভাবসমূহও (আসারাহুম) লিপিবদ্ধ করি।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২)
আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, জীবদ্দশায় মানুষ যদি সচেতন না হয়, তবে তার কিছু ভুল পদক্ষেপ মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় গুনাহ যুক্ত করতে থাকে। নিচে প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাপ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। কেউ অশ্লীল ছবি, ভিডিও, গান বা পাপের কাজে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট প্রকাশ করলে এবং এর মাধ্যমে অন্যরা পাপে জড়ালে তার দায়ও প্রকাশকারীর ওপর আসতে পারে। কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরও তার প্রকাশিত কনটেন্ট ইন্টারনেটে থেকে যেতে পারে। মানুষ সেগুলো দেখে বা শেয়ার করে পাপে জড়ালে এবং এর প্রচারে প্রকাশকারীর দায় বা সহযোগিতা থাকলে সে গুনাহের অংশীদার হবে।
২. দ্বীনের নামে ভুল শিক্ষা প্রচার করা
কেউ ধর্মের নামে যাচাই না করে ভুল তথ্য প্রচার করলে, ভিত্তিহীন বিশ্বাস ছড়িয়ে দিলে কিংবা মানুষকে অন্যায় ও অনৈতিকতার দিকে আহ্বান জানালে এর প্রভাব মৃত্যুর পরও চলতে পারে। বই, প্রবন্ধ, ভিডিও বা বক্তৃতার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ভুল শিক্ষা অনুসরণ করে মানুষ পাপে জড়ালে প্রচারকও এর দায় থেকে মুক্ত থাকবেন না। বিশেষ করে কোরআন-হাদিসের নামে কোনো কথা প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
৩. অন্যায় প্রথা ও ক্ষতিকর সংস্কৃতি চালু করা
কেউ সমাজে কোনো অন্যায় প্রথা চালু করল, যা পরবর্তী সময়ে অন্যরা অনুসরণ করতে থাকল। যেমন, যৌতুকের মতো সামাজিক অন্যায়কে উৎসাহিত করা, অশালীন আয়োজনের প্রচলন করা কিংবা অপচয়ের প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেওয়া। মানুষ সেই প্রথা অনুসরণ করে অন্যায় করলে এর প্রবর্তকও গুনাহের অংশীদার হবেন। একইভাবে ধর্মের নামে শরিয়তবিরোধী কোনো মনগড়া ইবাদত বা রীতি প্রচলন করে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করলেও এর দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। তবে শরিয়তসম্মত কোনো নতুন ব্যবস্থা বা বৈধ সামাজিক রীতিকে বিদআত বলা যাবে না।
৪. পাপের কাজে সহযোগিতার মাধ্যম তৈরি করা
কেউ জেনে-বুঝে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বা ব্যবস্থা গড়ে তুলল, যার মাধ্যমে সুদ, জুয়া, মাদক কিংবা অন্যকোনো হারাম কাজ পরিচালিত হয়। তার মৃত্যুর পরও সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যায় চলতে থাকলে এর দায় তার ওপর আসবে। তবে কোনো ব্যক্তি বৈধ উদ্দেশ্যে কোনো কিছু তৈরি করার পর অন্যরা সেটি অপব্যবহার করলে নির্মাতাকে দায়ী করা যাবে না। অন্যায়ের উদ্দেশ্য, সরাসরি সহযোগিতা ও সংশ্লিষ্টতা এখানে বিবেচ্য।
৫. ভ্রান্ত ফতোয়া দেওয়া
ধর্মীয় বিষয়ে না জেনে ফতোয়া দেওয়া গুরুতর অপরাধ। কেউ নিজের অজ্ঞতা বা ভুল বোঝার কারণে ভুল ফতোয়া দিলে এবং মানুষ তার ওপর নির্ভর করে ভুল পথে পরিচালিত হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। একইভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে জেনে-বুঝে আল্লাহর বিধান বিকৃত করে হারামকে হালাল বলে প্রচার করা গুরুতর গুনাহ। তার কথায় প্রভাবিত হয়ে অন্যরা সেই ভুল সিদ্ধান্ত অনুসরণ করলে তাদের পাপের দায় তার ওপরও আসতে পারে।
৬. সন্তান ও পরিবারকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত করা
সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতা থেকে দূরে রাখা, অন্যায়ে উৎসাহিত করা কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করার কারণে পিতা-মাতা গুনাহগার হতে পারেন। সন্তানকে ভালো-মন্দের শিক্ষা দেওয়া এবং সঠিক পথে পরিচালিত করা তাদের দায়িত্ব।
তবে সন্তান নিজের ইচ্ছায় যে অন্যায় করে, তার সব দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিতা-মাতার ওপর বর্তায় না। কিন্তু পিতা-মাতা যদি তাকে অন্যায়ের শিক্ষা দেন, পাপের কাজে সহযোগিতা করেন বা ভুল পথে পরিচালিত করেন, তাহলে সেই সংশ্লিষ্টতার জন্য তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে।
সুতরাং, মৃত্যুর পর নেক আমলের ধারা চিরঞ্জীব রাখতে যেমন ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবহমান সওয়াবের সুযোগ রয়েছে, তেমনি একটু অসতর্কতা বা কুপ্রবৃত্তির কারণে চিরস্থায়ী গুনাহের ফাঁদেও পড়তে হতে পারে। তাই জীবিত থাকতেই নিজের কর্ম, চিন্তা, সৃষ্টি এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা রেখে যাওয়া নিদর্শনগুলোকে শরিয়তসম্মত ও কল্যাণময় করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।