চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত বাড়তি শুল্কের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে যে পালাবদল ঘটছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশের জুতা শিল্প।
চামড়ার পাশাপাশি চামড়াবিহীন (নন-লেদার) জুতা রপ্তানিতে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে বাংলাদেশ।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান এবং সরকারের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা পেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এ খাতের রপ্তানি আয় বর্তমানের পৌনে ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি করে ২৫ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।
বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা) অনুযায়ী এর পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি।
রপ্তানির চালচিত্র
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি থেকে মোট ১২২ কোটি ৭৮ লাখ ডলার (১.২২ বিলিয়ন) আয় হয়, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।
এর সঙ্গে কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আয় যোগ করলে গত অর্থবছরে এ খাত থেকে মোট আয় দাঁড়ায় ১৭৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে জুতা রপ্তানির মোট আয়ের মধ্যে চামড়ার জুতা থেকে এসেছে ১৫ কোটি ১০ লাখ ৩০ হাজার ডলার, প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ।
অন্যদিকে, চামড়াবিহীন জুতা বা নন–লেদার ফুটওয়্যার থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ।
চীনের পিছিয়ে পড়া ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি জুতার সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র।
দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ২২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের জুতা আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি।
কয়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে জুতার বাজারে ৬০ শতাংশের বেশি হিস্যা ছিল চীনের দখলে। কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধের জেরে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বাড়তি শুল্কের কারণে সেই চিত্রে পরিবর্তন এসেছে।
অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের জুতা রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। সেই হিস্যা দখল করছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারত। পাশাপাশি সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের জন্যও।
লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সহসভাপতি নাসির খান বলেন, “বাংলাদেশের জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র; মোট আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি আসে সেখান থেকে। ট্রাম্প শুল্কের কারণে চীনের একচেটিয়া বাজার হোঁচট খেয়েছে, যা আমাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ।”
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে আমাদের চেয়ে চীনের শুল্ক এখন চার গুণেরও বেশি। জুতা শিল্প বরাবরই শ্রমনিবিড়। শ্রমিকের কম মজুরির কারণে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। আমরা যদি চীনের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া বাজারের ২-৩ শতাংশও দখল করতে পারি, তবে দুই বছরের মধ্যেই ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব।”
এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের এক্সপোর্ট ইউনিটের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) মো. নসরুল্লাহও একই মত পোষণ করেন।
তিনি বলেন, “ট্রাম্প শুল্ক আমাদের জন্য অনেক সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। গত অর্থবছরে আমরা রপ্তানিতে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। প্রচুর ক্রয়াদেশ আসছে, যার সব আমরা নিতেও পারছি না।”
সংকট ও উত্তরণের উপায়
সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে বেশ কিছু সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন উদ্যোক্তারা।
এপেক্স ফুটওয়্যারের মো. নসরুল্লাহ বলেন, “প্রধান সমস্যা গ্যাস-বিদ্যুৎ। দিনে ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ডিজেল দিয়ে কারখানা চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে; ফলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের অসন্তোষের কারণে রপ্তানিকারকদের অনেক সময় বাইরে থেকে কাঁচামাল কিনতে বা আমদানি করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান হলে তৈরি পোশাকের ওপর দেশের অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমবে বলে মনে করেন এপেক্স ফুটওয়্যারের এই কর্মকর্তা।
চামড়াবিহীন জুতা: নতুন দিগন্ত
ফ্যাশনেবল, টেকসই ও সাশ্রয়ী হওয়ায় বিশ্বজুড়ে চামড়াবিহীন জুতার (নন–লেদার) চাহিদা বাড়ছে।
দেশে চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানির জন্য ময়মনসিংহের ভালুকায় বড় কারখানা গড়ে তুলেছে ন্যাশনাল পলিমার (এনপলি) গ্রুপ।
শুনিভার্স ফুটওয়্যার নামের কারখানাটিতে মাসে প্রায় ৪ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন হয়। মাসে গড়ে ৩০ লাখ ডলারের বেশি জুতা রপ্তানি হয় এবং সেখানে প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক কাজ করেন বলে জানান কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ।
রপ্তানির সম্ভাবনা দেখে গত বছরের শুরুতে কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রিয়াদ বলেন, বলেন, “আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারখানার পুরো সক্ষমতা অনুযায়ী ক্রয়াদেশ রয়েছে। চীন থেকে বড় কোম্পানিগুলো মুখ ফিরিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে। এই চাহিদা পূরণে এখন দেশের প্রয়োজন পর্যাপ্ত কাঁচামাল আর দক্ষ জনবল।”
এছাড়া প্রান্তিক পর্যায়েও গড়ে উঠছে বিশ্বমানের কারখানা। রংপুরের তারাগঞ্জে ২০১৭ সালে দুই ভাই মো. হাসানুজ্জামান ও মো. সেলিম সাড়ে ৯ একর জমির ওপর গড়ে তোলেন ব্লিং লেদার। পরে সেলিম মারা যান।
কারখানাটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। এখানকার তৈরি জুতা পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানুজ্জামান বলেন, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে তারা এ কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন। এখন তাদের লক্ষ্য উৎপাদন আরও বাড়ানো। দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ শু সিটি লিমিটেড (বিএসসিএল) নামে একটি শিল্পপার্ক গড়ে তুলেছে জেনিস গ্রুপ।
গাজীপুরের মৌচাকে ৩৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই সিটিতে জুতা উৎপাদনের প্রায় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তৈরি হচ্ছে বলে জানান এ কোম্পানির চেয়ারম্যান নাসির খান।
তিনি বলেন, “আমরা চামড়া ও চামড়াবিহীন দুই ধরনের জুতাই রপ্তানি করে থাকি। এই সিটি আমরা এমনভাবে গড়ে তুলেছি যাতে জুতা তৈরির প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাঁচামাল এখানে পাওয়া যায়। আমদানির প্রয়োজন না হয়।”
বিশ্ববাজারে জুতা রপ্তানিতে এখনো ৬০ শতাংশ দখল নিয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। এরপর রয়েছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, তুরস্ক ও ভারত।
বাংলাদেশের হিস্যা এখনো কম হলেও, উদ্যোক্তারা মনে করেন, সরকারি নীতি সহায়তা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই এই তালিকায় ওপরের দিকে উঠে আসতে পারবে।
সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম