মনজুর এ আজিজ : ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়ে বন্দিশালায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার ঘটনা থামছে না। মঙ্গলবার লিবিয়ার বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক থাকা আরও ১৬৮ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এর আগে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কয়েক দফায় আরও ১ হাজার ৫৪৮ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানো হয়েছে। ফলে ১৫ মার্চ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রত্যাবাসনের তথ্য অনুযায়ী অন্তত ১ হাজার ৭১৬ বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন।
গতকাল ফেরত আসা ১৬৮ জন বাংলাদেশি বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ছিলেন। বুরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে তারা ঢাকায় পৌঁছান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে লিবিয়া সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় তাদের প্রত্যাবাসন করা হয়।
ফেরত আসা বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে অনিয়মিতভাবে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সমুদ্রপথে ইউরোপে, বিশেষ করে ইতালিতে পৌঁছানো। কিন্তু ইউরোপের পথে লিবিয়াতেই তাদের অনেকের যাত্রা থেমে যায়। কেউ আটক হন বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে, আবার কেউ পাচারকারীদের হাতে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
চলতি বছরের এপ্রিলেও লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টার থেকে ১৭৪ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানো হয়। তাঁদের অধিকাংশই মানবপাচারকারীদের প্ররোচনায় সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়। এরপর ২৫ মে ১৭০ জন এবং ২৪ জুন আরও ১৭০ বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। জুনের দফায় বেনগাজীর গানফুদা ও ত্রিপোলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশিরাও ছিলেন।
জুলাইয়ে গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার থেকে আরও ১৭১ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আগস্টে এক দফায় ৩৪০ জন, পরে ১৭৪ জন এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকে আরও ১৭৪ জন দেশে ফেরেন। এই ধারাবাহিক প্রত্যাবাসনের আগে ১ এপ্রিলও ১৭৫ বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১১৩ জন ত্রিপোলির তাজুরা এবং ৬২ জন বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ছিলেন।
লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের আটকে পড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে ইউরোপে যাওয়ার অবৈধ রুট। মানবপাচারকারীরা কাজের সুযোগ বা ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেককে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। পরে তাদের কেউ কেউ আটক হন, কেউ পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হন। এভাবে ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা অনেকের পরিণতি হয় লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে।
ফেরত আসা বাংলাদেশিদের জন্য আইওএমের মাধ্যমে বিমানভাড়া, খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে লিবিয়ায় আটক বা বিপদগ্রস্ত অন্য বাংলাদেশিদেরও পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যাবাসনের ধারাবাহিকতা বলছে, লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতার পাশাপাশি সেখানে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াও চলমান। গত কয়েক মাসে প্রায় প্রতি মাসেই কয়েক দফায় বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ১৬৮ জন সেই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলেন।