কেরানীগঞ্জের তরুণ আসিফ আলী ইফতি রাশিয়ার একটি প্যাকেজিং কোম্পানিতে কাজের আশায় ৬ লাখ টাকায় চুক্তি করেন পাটওয়ারী অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে একটি এজেন্সির ওভারসিজ ডিরেক্টর পরিচয় দেয়া শাহনাজ পারভীনের সঙ্গে। শাহনাজ পারভীন একই সঙ্গে অনামিকা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিরও স্বত্বাধিকারী। গত ২৫ জুন ইফতিসহ সাত বাংলাদেশীকে রাশিয়ার দূতাবাসের সামনে নেয়া হয়। তবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তাদের দূতাবাসে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। একটি গাড়িতে বসেই তাদের পুরো সময় কাটাতে হয়। অথচ এ সময় অন্য অনেক বাংলাদেশী ভিসাপ্রত্যাশীকে দূতাবাসে প্রবেশ করতে দেখেন ইফতি। সূত্র: বণিকবার্তা
দূতাবাসের অফিস সময় শেষ হওয়ার পর কামাল নামে এক বাংলাদেশী সেখানে আসেন। তিনি সাতজনের পাসপোর্ট নিয়ে দূতাবাসে প্রবেশ করেন। মাত্র ২ মিনিট পরই দ্রুত বেরিয়ে এসে গাড়িতে ওঠে চলে যান। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে কামাল জানান, তাদের ভিসার কাজ হয়ে গেছে এবং ভিসার জন্য কাউকে দূতাবাসে সাক্ষাৎকার দিতে বা ‘ফেস’ করতে হবে না। এর দুদিন পর ইফতিকে ভিসার ছবি পাঠান শাহনাজ পারভীন।
ঘটনাটি বাংলাদেশী কর্মীদের রাশিয়ায় যাওয়ার প্রচলিত ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাধারণত বাংলাদেশ থেকে কর্মী হিসেবে রাশিয়ায় যেতে হলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্রের মাধ্যমে নিবন্ধিত কোনো কোম্পানির অধীনে ‘এমপ্লয়মেন্ট ভিসা’ নিতে হয়। তবে সম্প্রতি ঢাকার রুশ দূতাবাস থেকে অন্তত সাত বাংলাদেশী তরুণকে কোনো কোম্পানির নিয়োগের বিপরীতে নয়, রাশিয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় ও গভর্নর প্রশাসনের আমন্ত্রণে ‘সার্ভিস ভিসা’ দেয়া হয়েছে। প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে একবার প্রবেশযোগ্য (সিঙ্গেল এন্ট্রি) এসব ভিসা ইস্যু করা হয়েছে।
পাসপোর্ট ও ভিসা-সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাতজনের মধ্যে পাঁচজন আসিফ আলী ইফতি, মো. মাহবুব আলম, মো. ফায়গুর ইসলাম, মো. হৃদয় মোল্লা ও মো. শাহে আলম রাশিয়ার ‘তুলা অঞ্চলের আঞ্চলিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়’-এর সরাসরি আমন্ত্রণে সার্ভিস ভিসা পেয়েছেন। অন্যদিকে সৌরভ নামের এক তরুণ ভিসা পেয়েছেন ‘আরখানগেলস্ক অঞ্চলের গভর্নরের প্রশাসন ও আঞ্চলিক সরকার’-এর আমন্ত্রণে। জহিরুল ইসলাম নামের আরেক তরুণের ভিসা ইস্যু হয়েছে ‘তাতারস্থান প্রজাতন্ত্রের ক্যাবিনেট কার্যালয়’-এর আমন্ত্রণে।
এ সাতজনের বাইরেও রাশিয়ার দূতাবাসে বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদনসংক্রান্ত আরো একটি গোপন নথি পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট ঢাকায় অবস্থিত রুশ দূতাবাসে মোট ১৮ বাংলাদেশীর ভিসার আবেদন জমা পড়ে। এর বিপরীতে ৪৩৩ নম্বর একটি রসিদ ইস্যু করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৮২৬০ নম্বর টেলিগ্রামের মাধ্যমে পাঠানো এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একবার প্রবেশযোগ্য ভিসা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে ৩১ আগস্ট ভিসা প্রস্তুত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। নথিটিতে দূতাবাসের এমভি ভোলোসোভার স্বাক্ষরও রয়েছে। প্রাপ্ত তালিকায় ইমন পাল, সানি আহমেদ, সাজিদুর রহমান, প্রদীপ সরকার ও ফিরোজ হোসেনসহ মোট ১৮ বাংলাদেশী তরুণের নাম ও আবেদন নম্বর সংযুক্ত রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো দেশের আঞ্চলিক ‘নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়’ বা ‘গভর্নর কার্যালয়’ থেকে সরাসরি সরকারি বা সার্ভিস ভিসা ইস্যু করার ঘটনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও অনিয়মতান্ত্রিক। রাশিয়ার ক্ষেত্রে বিএমইটির প্রচলিত ভিসা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ নাগরিকদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় নেয়ার এ প্রক্রিয়া নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক জনবল ঘাটতি পূরণে সরাসরি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির চুক্তি ছাড়াই ‘সার্ভিস ভিসা’র আড়ালে বিদেশী নাগরিকদের যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কৌশলগত কাজে কিংবা দেশটির বাহিনীতে যুক্ত করার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। ফলে এ ধরনের ভিসা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশী কর্মীদের প্রকৃত কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও নিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সার্ভিস ভিসার নথি যাচাই করতে বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (কর্মসংস্থান) মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি নথি যাচাই করে বণিক বার্তাকে জানান, সার্ভিস ভিসার বিপরীতে যে বিএমইটি ছাড়পত্র তৈরি করা হয়েছে তা ফেক। এ ভিসাগুলো কর্মী ভিসা নয়।
সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ভিসায় যাওয়া ব্যক্তিদের সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। আর এ ধরনের ভিসা অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে মাত্র ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই রুশ দূতাবাস থেকে ইস্যু করা হয়। গুলশানে দেশটির দূতাবাসের বাইরে স্থানীয় একটি দালাল চক্র এর জন্য উচ্চ মূল্যে কর্মী সংগ্রহ করে থাকে।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া প্রতিদিন গড়ে এক হাজার সৈন্য নিয়োগ করলেও প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজারের বেশি সৈন্য হারাচ্ছে, যা মস্কোর সামরিক বাহিনীতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ঘাটতির কারণে কয়েক লাখ নতুন সৈন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বর্তমানে রাশিয়ার নেই।
সার্ভিস ভিসা পাওয়া মো. শাহে আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে কথা ছিল কোম্পানি ভিসা দেবে। কিন্তু ভিসার ছবি পাঠানোর পর সেটি অনুবাদ করে দেখি, কোনো কোম্পানির নাম নেই; বরং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নাম রয়েছে। তখনই আমার সন্দেহ হয়। এরপর অনামিকা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী শাহনাজ পারভীনের কাছে কোম্পানির কাগজপত্র চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। এর মধ্যে তিনি আমার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখন ফোন দিলেও ধরছেন না। মধ্য বাড্ডার প্রগতি টাওয়ারে দেয়া অফিসের ঠিকানায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পাশের একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, তিনি ওই অফিস ছেড়ে দিয়েছেন।’
মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, প্রায় এক মাস আগে এক বাংলাদেশী দূতাবাসে ফোন করেন। তিনি জানান, সার্ভিস ভিসায় তিনিসহ দুজন বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় এসেছেন। তাদের বলা হয়েছিল, কোম্পানিতে চাকরির জন্য ভিসা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ায় আসার পর তাদের যুদ্ধে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে তাদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। তাদের রক্ষা করতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধও করেন তারা।
রাশিয়ায় বাংলাদেশী নাগরিকদের যুদ্ধে জড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ রাষ্ট্রদূতকে বৈঠকের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন। তবে রুশ রাষ্ট্রদূত এতে কোনো সাড়া দেননি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বৈঠক হলে বাংলাদেশী কর্মীদের যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে রুশ রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হতে পারে। এ কারণেই হয়তো তিনি বৈঠকের অনুরোধে সাড়া দেননি।’
এদিকে মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে কোনো কর্মী কাজের ভিসায় রাশিয়ায় এলে কোম্পানির ডিমান্ড লেটারের বিপরীতে দূতাবাস থেকে সত্যায়ন নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ সাত তরুণের কেউই প্রচলিত নিয়মে দূতাবাসের সত্যায়ন ও বিএমইটির ছাড়পত্র নেয়নি।’
দূতাবাসের সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি “সার্ভিস ভিসা” নামক এক বিশেষ শ্রেণীর ভিসায় অনেকে রাশিয়ায় আগমন করছেন, যা দূতাবাসের সত্যায়ন বা যাচাইকৃত নয়। যেসব চাহিদাপত্র দূতাবাস থেকে সত্যায়ন করা হয়নি, সেসব কাজ পরিহার করা বাঞ্ছনীয় এবং এ ধরনের ভিসার মাধ্যমে রাশিয়ায় আসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ করছি। কিছু অসাধু ব্যক্তি ও চক্র কোম্পানিতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে যাচ্ছে। কাজ দেয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তারা প্রবঞ্চনা করে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা জীবননাশের চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।’
ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন ভিসা ক্যাটাগরির তালিকায় ‘সার্ভিস ভিসা’ নামে কোনো ভিসার উল্লেখ নেই। নথি অনুযায়ী, চাকরি বা কাজের জন্য রয়েছে এমপ্লয়মেন্ট ভিসা; এছাড়া বিজনেস, উচ্চ শিক্ষার জন্য স্টুডেন্ট, ট্যুরিস্ট, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সফরের জন্য প্রাইভেট, হিউম্যানিটারিয়ান ও ট্রানজিট ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশী নাগরিকদের দেয়া তথাকথিত ‘সার্ভিস ভিসা’র বৈধতা ও প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক একটি সূত্রের দাবি, বাংলাদেশী তরুণদের যে ‘সার্ভিস ভিসা’ দেয়া হচ্ছে, সেটি মূলত একটি বিশেষ ধরনের ভিসা। এর মাধ্যমে তাদের রাশিয়ার হয়ে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে জানতে ঢাকার রুশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এ নিয়ে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাকে অফিশিয়ালি চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এরই মধ্যে সার্ভিস ভিসার বিষয়ে কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। অন্য একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য, আমাদের দেশের কোনো নাগরিক যেন কোনোভাবেই প্রতারিত হয়ে যুদ্ধে না জড়ায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অনেক প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। কোম্পানিতে কাজের কথা বলে মানুষকে রাশিয়ায় এনে একপ্রকার বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। সম্প্রতি ৩০ জনকে আমরা আর্মির কাছ থেকে ফেরত এনেছি।’