নাটোরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কাঁচাগোল্লা। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এ মিষ্টির খ্যাতি একসময় দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লেও বর্তমানে ভেজাল ও বিকৃতিকরণের কারণে এর সুনাম নষ্ট হচ্ছে। মুনাফার আশায় কিছু ব্যবসায়ী নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি মিষ্টি কাঁচাগোল্লা নামে বিক্রি করায় প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা। ২০২৩ সালে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেলেও মান রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
জনশ্রুতি রয়েছে, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাটোর শহরের লালবাজারে মধুসূদন পালের দোকানে কাঁচাগোল্লার উৎপত্তি। পরে ১৭৫৭ সাল থেকে এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। রাণী ভবানীর সময় কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। রাজা-জমিদারদের মিষ্টিমুখেও ব্যবহৃত হতো এ মিষ্টি।
নাটোর জেলা প্রশাসনের আবেদনের পর ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর কাঁচাগোল্লাকে দেশের ১৭তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি নাটোরের একমাত্র জিআই পণ্য।
তবে বর্তমানে কাঁচাগোল্লার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করছেন। এমনকি নাটোরের বাসস্ট্যান্ড, ট্রেনসহ বিভিন্ন পরিবহনে ময়দা দিয়ে তৈরি লাড্ডুও কাঁচাগোল্লা নামে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব মিষ্টির সঙ্গে প্রকৃত কাঁচাগোল্লার কোনো মিল নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক মিষ্টির দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার কেজি কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়, যার কেজিপ্রতি দাম ৬০০ থেকে ৬৮০ টাকা। হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ টাকার কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় শত শত পরিবার। বাড়ি বাড়ি থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ, ছানা তৈরি ও কাঁচাগোল্লা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
তবে দেশের বাইরে এখনো বাণিজ্যিকভাবে কাঁচাগোল্লা রপ্তানি শুরু হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং রপ্তানিমুখী উদ্যোগ নেওয়া হলে এর প্রসার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে মানসম্পন্ন কাঁচাগোল্লা উৎপাদনে প্রশাসন ও ব্যবসায়ী নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
লালবাজারের জয়কালী বাড়ি মিষ্টির দোকানের স্বত্বাধিকারী রবীন্দ্রনাথ কুন্ড বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে আমি এই দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি করে আসছি। এর আগে আমাদের বাপ-দাদারা কাঁচাগোল্লা তৈরি করেছেন। একসময় প্রতিদিন কয়েক মণ বিক্রি হলেও এখন দিনে এক মণও বিক্রি হয় না। বর্তমানে মানসম্পন্ন কাঁচাগোল্লা তৈরির কারিগর খুবই কম।’
নাটোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নাফ বলেন, ‘রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ প্রয়োজন।’
কাঁচাগোল্লা মূলত দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়। ঝরঝরে ও হালকা রসালো এ মিষ্টির স্বতন্ত্র স্বাদই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে বছরে একবার উদ্বুদ্ধকরণ সভা করা হলেও মান রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন