সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে যে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গোপনে ঢাকা সফর করেছেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দৈনিক ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে আপাতত কিছুই জানেন না এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নির্দেশ না আসা পর্যন্ত কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। এই ধোঁয়াশার মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে ভারত কেন এত মরিয়া হয়ে তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে চাইছে? এর পেছনে কী স্বার্থ কাজ করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে আনতে চাইছে ভারত। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে পুরোনো কাঠামো সচল রাখার সুযোগ দেখছে তারা। এ প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম দিল্লিতে দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আগস্টে ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরদিন দিল্লিতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এক মন্তব্যে উল্লেখ করেছেন, যেকোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কার্যকর করতে হলে তা অবশ্যই ্রপারস্পরিক স্বার্থের“ পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। এই বক্তব্যকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন ও পারস্পরিক চাহিদার প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখ-ের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংযোগ সহজ করতে পারে। সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।
তবে এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জটিলতার জায়গা হয়ে আছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা বারবার জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক আসামিদের বিষয়ে অগ্রগতি না হলে দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ পুরোপুরি স্বাভাবিক করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা নিউইয়র্কে অন-ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। তবে তারা বুঝতে পারছেন যে বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের বৈরিতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা আশা করছেন দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছাবে।
এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর বারবার আলোচনায় এলেও তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। আগস্টে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠানের মহড়ার কারণে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। পরে সেই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন সফর নিয়ে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, সফরের বিষয়ে তখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। তবে শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল বক্তব্য দেওয়ার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ঢাকার পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয় এবং ভারতকে অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি অজিত দোভালের ঢাকায় আসা নিয়ে ভারতীয় ও বাংলাদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত বা অস্বীকার করা হয়নি। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সম্ভাব্য সফরটি তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রস্তুতি এবং দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আলোচনায় সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি এবং নিরাপত্তার মতো বিষয় থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন করে খবর এসেছে, ভারত ও বাংলাদেশ নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে আলোচনা করছে। তবে এটিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। ঢাকার জন্য শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রয়েছে। একই সময়ে তারেক রহমানের জন্মদিনে নরেন্দ্র মোদিকে শুভেচ্ছা জানানো এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত জবাব দেওয়ার ঘটনাকেও দুই দেশের সম্পর্কের যোগাযোগ অব্যাহত থাকার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত আগস্টে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং) এর প্রধান পরাগ জৈন সম্প্রতি ঢাকায় সরকারি সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশের আমন্ত্রণে তিনি চার সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি এবং শৈবাল রায় চৌধুরী। তবে এই সফরের বিষয়ে ভারত বা বাংলাদেশ কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। উল্লেখ্য, ঢাকা সফরের আগে পরাগ জৈন চীন সফর করেছিলেন।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও জ্বালানি, পানি বণ্টন এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। দিল্লি যেমন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তেমনি ঢাকাও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ ও অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে। ফলে তারেক রহমানের দিল্লি সফর শেষ পর্যন্ত কবে হবে, সফরের আগে ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান কী দাঁড়ায় এসব বিষয়ই আগামী দিনের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ইনকিলাব