শিরোনাম
◈ বেসরকারীকরণের উদ্যোগে ঝুঁকিতে পড়তে পারে জ্বালানি খাত ◈ পাহাড়ে চাঁদাবাজির ভয়াল সাম্রাজ্য, বছরে আদায় হাজার কোটি টাকা ◈ প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে আত্মহত্যা, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার নির্মম চিত্র ◈ রাশিয়া থেকে ভারত, পাঁচ দেশ পেরিয়ে নতুন রেলপথের প্রস্তাব ◈ শ্রমবাজারে যুদ্ধের ধাক্কা, বিকল্প গন্তব্য খুঁজছে বাংলাদেশ ◈ উপজেলা পর্যায়ে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেবে সরকার ◈ এসএসসি ফল প্রকাশ আজ, দ্রুত জানবেন যেভাবে ◈ ফ্লাইট দেরি বা বাতিল হলে খাবার-হোটেল-রিফান্ড, কোন এয়ারলাইনস কী দেয় ◈ সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুন: ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু ◈ ইলিয়াস আলী গুমের অভিযোগে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

প্রকাশিত : ১০ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩১ সকাল
আপডেট : ১০ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:১১ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পাহাড়ে চাঁদাবাজির ভয়াল সাম্রাজ্য, বছরে আদায় হাজার কোটি টাকা

মেঘ-পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভয়াল রূপ ধারণ করছে চাঁদাবাজি। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে নির্মাণপ্রকল্প, পরিবহন, পর্যটনসহ আয়ের প্রায় সব খাতেই দিতে হচ্ছে চাঁদা। এমনকি বাড়ির মুরগি বিক্রি করলে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

চাঁদাবাজির শিকার ভুক্তভোগী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সক্রিয় কয়েকটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন বিভিন্ন খাত থেকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। এই অর্থের বড় একটি অংশ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম, অস্ত্র সংগ্রহ ও আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ।

চাঁদাবাজির এই অর্থনীতি শুধু পাহাড়ের মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে না, বরং পাহাড়ে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করে স্থানীয় প্রশাসন।

চাঁদাবাজির অর্থ কোথায় যাচ্ছে- সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ অস্ত্র সংগ্রহ, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সশস্ত্র সদস্যদের পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।

বছরে হাজার কোটি টাকার চাঁদা

স্থানীয় ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএস (মূল), ইউপিডিএফ (মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), এমএনপি ও কেএনএফসহ কয়েকটি সংগঠন বিভিন্ন খাত থেকে বছরে মোট এক হাজার ৫৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে।

রাঙ্গামাটি

জেএসএস (মূল) দল বছরে ২৯৭ কোটি টাকা, ইউপিডিএফ (মূল) দল ২১২ কোটি, জেএসএস (সংস্কার) দল ১১০ কোটি, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দল ১১২ কোটি ও এমএনপি ২ কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। শুধু রাঙ্গামাটি জেলা থেকেই পাঁচটি সশস্ত্র সংগঠন চাঁদা তুলছে ৭৩৪ কোটি টাকা।

খাগড়াছড়ি

জেএসএস (মূল) দল বছরে ২৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, ইউপিডিএফ (মূল) দল ১০২ কোটি, জেএসএস (সংস্কার) দল ৬৭ কোটি ৫৩ লাখ এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দল ৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। খাগড়াছড়ি জেলা থেকেই চারটি সশস্ত্র সংগঠন চাঁদা তুলছে ২৫৮ কোটি টাকা।

বান্দরবান

জেএসএস (মূল) দল বছরে ৪৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দল ১০ কোটি ৩৫ লাখ এবং কেএনএফ ২ কোটি ৮২ লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। বান্দরবান জেলা থেকে তিনটি সশস্ত্র সংগঠন চাঁদা তুলছে ৬২ কোটি টাকার বেশি।

এই বিপুল অবৈধ অর্থের উৎস শুধু বড় ব্যবসা নয়, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, ঠিকাদার, হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী, বনজীবী ও বিভিন্ন সেবা খাতের মানুষও চাঁদার আওতায়।

মুরগি বিক্রিতেও চাঁদার ভাগ

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার প্রত্যন্ত সাপমারা গ্রামের এক নারী জাগো নিউজকে জানান, সম্প্রতি তিনি ১২শ টাকায় একটি দেশি মুরগি বিক্রি করেন। ওই বিক্রির পর তাকে ১৮০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

চাঁদার টাকা কাকে দিয়েছেন এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে রাজি হননি তিনি। তিনি বলেন, জীবনের ভয় আছে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি কোনো কিছু বিক্রি করলে বিভিন্ন পক্ষকে চাঁদা দিতে হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু মুরগি নয়, সবজি, ফল, গবাদিপশু, কাঠ, মাছসহ বিভিন্ন কৃষি ও বনজ পণ্য পরিবহন এবং বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও চাঁদা দিতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তার ওপরও।

টোকেন ছাড়া চলে না গাড়ি

পাহাড়ের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও মালবাহী যানবাহনের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার পর অনেক যানবাহনকে টোকেন দেওয়া হয়। সেই টোকেন দেখিয়েই বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করতে হয়। চাঁদা না দিলে গাড়ি আটকে দেওয়া, চালককে হুমকি কিংবা মারধরের অভিযোগও রয়েছে।

যখনই চাঁদা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে রিপোর্টেড হয় আমরা সেটা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেই। তবে অনেকে ভয়ে থানায় আসে না। কিন্তু একবার কেউ থানায় এলে তার নিরাপত্তা পুলিশ দেয়।-খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. মিজানুর রাহমান 

খাগড়াছড়ি থেকে রামগড়ের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। একটি কোম্পানির বিস্কুটের গাড়ি যেতে চারটি জায়গায় চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ। না হলে কোনো গাড়িই রামগড় পর্যন্ত পৌঁছায় না। শুধু রামগড় নয়, পার্বত্য অঞ্চলের সব পরিবহন কিংবা কোম্পানির গাড়িকে চাঁদা দিতে হয় সশস্ত্র সংগঠগুলোকে।

এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে বর্গফুটপ্রতি ২০০ টাকা এবং ট্রাকপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারদের কাছ থেকেও প্রকল্পের আকার অনুযায়ী লাখ লাখ টাকা দাবি করা হয়।

উন্নয়ন প্রকল্পেও ভাগ

পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদার দাবি পূরণ না হলে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা শ্রমিক ও ঠিকাদারদের ভয়-ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

এতে একদিকে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক ঠিকাদার ও শ্রমিক দুর্গম এলাকায় কাজ করতেও অনাগ্রহী হচ্ছেন।

মোবাইল টাওয়ার থেকে হোটেল- কোথাও রেহাই নেই

চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা খাতেও। যে কোনো মোবাইল টাওয়ার নির্মাণের কথা জানতে পারলেই সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে অপহরণও করে তারা।

খাগড়াছড়িতে একটি মোবাইল অপারেটরের প্রতিনিধির দাবি, ইউপিডিএফ ও জেএসএসের পক্ষ থেকে তাদের কাছে চার কোটি ৮০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় কয়েকটি টাওয়ারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং একজন কর্মকর্তাকে অপহরণ করা হয়।

পর্যটন খাতও এর বাইরে নয়। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক পর্যন্ত বিভিন্ন হোটেল-মোটেলকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।

চাঁদা না দিলে অপহরণ, হত্যার ভয়

চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনাও। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেক ক্ষেত্রে হুমকি, মারধর, অপহরণ কিংবা সম্পদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ৪৮ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জন পাহাড়ি ও ২৯ জন বাঙালি।

বান্দরবানের লামায় ছয় রাবার বাগান শ্রমিক অপহরণের পর তাদের মুক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করার ঘটনাও উঠে এসেছে। পরে সেনাবাহিনীর অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়।

রাঙ্গামাটিতে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় একটি পেঁপে বাগানের প্রায় ৮০০টি ফলবান গাছ কেটে ফেলা হয়।

চাঁদাবাজির টাকায় বাড়ছে সশস্ত্র সংঘাত

চাঁদাবাজির পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে ১০৫টি গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পাহাড়ি ২৪ জন ও বাঙালি দুজনসহ মোট ২৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৯ জন।

সাম্প্রতিক সময়েও খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে গুলি চালিয়ে হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ভয়ে মুখ খুলতে চান না ভুক্তভোগীরা

চাঁদাবাজির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো অভিযোগের পরিণতি নিয়ে আতঙ্ক। চাঁদাবাজির আতঙ্ক পাহাড়ে এমন পর্যায়ে ছেয়ে গেছে যে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিতে চায় না কেউ। অভিযোগ দিলে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চাঁদা না দিলে কী হতে পারে- এ ভয় থেকে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন না। ফলে চাঁদাবাজির প্রকৃত চিত্র কোনোভাবেই পুরোপুরি উঠে আসে না। এমনকি যেসব ব্যক্তি চাঁদা দিয়েছেন তারাও অনেক সময় কারা টাকা নিয়েছে তা প্রকাশ করতে চান না।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাড়ছে চাঁদা

আগে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরাসরি গিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বেশি থাকলেও এখন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। দূর পাহাড়ে প্রায় সব অপারেটরের নেটওয়ার্ক পৌঁছে যাওয়ায় বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চাঁদা আদায় হচ্ছে। ফলে চাঁদাবাজির অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি আরও সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে।

খাগড়াছড়ি পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাগো নিউজকে বলেন, আগে সরাসরি এসে চাঁদা নিয়ে যেত। এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চাঁদা দেওয়া লাগে। কোনো মাসে চাঁদা দিতে দেরি হলেই গাড়ি বন্ধ অথবা চালককে মারধর পর্যন্ত করে।’

পাহাড়ের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

চাঁদাবাজিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতির। একজন কৃষক যখন উৎপাদিত পণ্য বাজারে নেওয়ার সময় চাঁদা দেন, ঠিকাদার যখন প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দেন, পরিবহন মালিক যখন টোকেনের জন্য টাকা দেন কিংবা পর্যটন ব্যবসায়ী যখন নিয়মিত চাঁদার মুখোমুখি হন তখন এসব অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচেই যুক্ত হয়। ফলে পণ্যের দাম বাড়ে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ কমে যায়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটন ও বেসরকারি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ও অন্য সহিংসতার কারণে পাহাড়ের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। গত ২৮ জুলাই বান্দরবান প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবুর রহমান দাবি করেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৭টি অপহরণ ও ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

যা বলছে প্রশাসন

খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. মিজানুর রাহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যখনই চাঁদা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে রিপোর্টেড হয় আমরা সেটা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেই। তবে অনেকে ভয়ে থানায় আসে না। কিন্তু একবার কেউ থানায় এলে তার নিরাপত্তা পুলিশ দেয়।’

কারও কাছে চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা রয়েছে। চাঁদাবাজি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া মাত্র পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়।-খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত 

তিনি বলেন, ‘দুর্গম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত জটিল বা জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে কম্বাইন্ড অপারেশন (যৌথ অভিযান) পরিচালনা করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত অপারেশন উত্তরণের আওতায় যে কোনো আইনি সহায়তায় পুলিশ সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দেয়।’

রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাহাড়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় আমরা মাঝে মধ্যে অভিযোগ পাই। তবে কেউ মামলা করে আবার কেউ মামলা করে না। মামলা করুক বা না করুক অভিযোগ পেলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে ব্যবস্থা নেয়।’

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিজের পকেটের টাকা স্বেচ্ছায় কেউ দিতে চায় না। পাহাড়ে শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী বা সাধারণ মানুষকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও যাতায়াতের তাগিদে বাধ্য হয়েই চাঁদা দিতে হয়।’

বিচ্ছিন্নতাবাদী ও পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ক্যাম্প দুর্গম এলাকায় থাকায় প্রশাসনিক অভিযান চালানোও জটিল হয়ে পড়ে। তবে পাহাড়ে নিরাপত্তা বজায় রাখতে ও বড় ধরনের সংঘাত ঠেকাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে জানান তিনি।

পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠনের চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘কারও কাছে চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা রয়েছে। চাঁদাবাজি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া মাত্র পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়।’

পাহাড়ে মাঝে-মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তদন্ত ও পর্যবেক্ষণে এসব ঘটনার অনেকগুলোই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, গ্রুপিং কিংবা নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণে ঘটে।’

সূত্র: জাগো নিউস ২৪ 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়