ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০ ঘণ্টা রোম বিমানবন্দরে আটকে থাকতে হয়েছিল বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী প্রায় ১৭০ যাত্রীকে।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। হোটেলে যেতে না পেরে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে রাত কাটাতে হয়েছে তাদের।
যদিও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দাবি, বিমানবন্দরে থাকা যাত্রীদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
এ ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—দীর্ঘ বিলম্বের কারণে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হলে এয়ারলাইনসের দায়িত্ব কতটুকু ও আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনসগুলো কী ধরনের সেবা দিয়ে থাকে?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারওয়েজের প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে যাত্রীকে শুধু বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বা টার্মিনালে বসিয়ে রাখা এয়ারলাইনসের একমাত্র দায়িত্ব নয়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ‘যাত্রী অধিকার’ কাঠামোতে নির্দিষ্ট সময় পর যাত্রীদের খাবার, পানীয়, যোগাযোগের সুযোগ, প্রয়োজন হলে হোটেল ও বিমানবন্দর-হোটেল যাতায়াত এবং দীর্ঘ বিলম্ব হলে রিফান্ড বা বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করার নীতি রয়েছে।
তবে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে নীতিমালায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোথাও দুই ঘণ্টা পর থেকেই সেবা দেওয়ার বিধান রয়েছে, কোথাও আবার বিলম্বের সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যাদও কোনো এয়ারলাইনের ‘যাত্রী সেবা’ নীতিমালায় একজন যাত্রীকে বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা বসিয়ে রাখা যাবে—এমন কোনো সময় সীমা পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস, রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস (কেএলএম), স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস) ও থাই এয়ারওয়েজের ‘যাত্রী সেবা’ নীতিমালায় কী রয়েছে, তা তুলে ধরা হলো এখানে।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ: ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ফ্লাইট দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হলে তারা যাত্রীদের রিফ্রেশমেন্ট ভাউচার দেওয়ার চেষ্টা করবে। সেটি দিতে না পারলে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয়ের খরচ ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফ্লাইট ৩ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে বিলম্বের কারণের ওপর নির্ভর করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন যাত্রী।
ফ্লাইট বিলম্বের কারণে রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেলে থাকার খরচ এবং বিমানবন্দর থেকে হোটেল বা বাড়ি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবহন খরচ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
যাত্রীদের বাইরে যোগাযোগের জন্য দুটি ফোন কল বা ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ বিলম্বে উপযুক্ত বিকল্প ফ্লাইট দিতে না পারলে বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা বা যুক্তিসঙ্গত খরচ ফেরত দেওয়ার কথাও রয়েছে।
ফ্লাইট পাঁচ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে এবং যাত্রী আর ভ্রমণ করতে না চাইলে টিকিটের অর্থ ফেরত চাইতে পারবেন।
এছাড়া কোনো ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগের নিয়ম প্রযোজ্য হলে নগদ অর্থে রিফান্ড পাবেন।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস: ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের নীতিমালায় অন্য এয়ারলাইনসের মতো দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা বা চার ঘণ্টা—এভাবে নির্দিষ্ট ঘণ্টাভিত্তিক সময় উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিলম্ব অনুযায়ী, যাত্রীদের বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যেমন—দুপুরে খাবারের সময়ে বিলম্ব হলে যাত্রীদের খাবার দেওয়ার কথাও রয়েছে।
যাত্রীরা চাইলে টেলিফোন সেবা নিতে পারবেন।
দীর্ঘ বিলম্বে রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে, স্থানীয় যাত্রীদের ক্ষেত্রে হোটেল সুবিধা দেওয়া নাও দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে তাদের পরিবহন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস (কেএলএম)
কেএলএমের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ফ্লাইট দেরি হলে যাত্রীকে বিনামূল্যে বেশ কিছু সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
• অপেক্ষার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবার বা পানীয়
• রাত কাটতে হলে বা নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় অবস্থান করতে হলে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ও যাতায়াতের খরচ
• ১টি প্রিপেইড ফোন কার্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ মিনিটের ২টি ফোন কলের খরচ। বিকল্প হিসেবে ২টি ফ্যাক্স বা ২টি ই-মেইল পাঠানোর সুযোগ।
ফ্লাইট কমপক্ষে ৫ ঘণ্টা দেরি হলে এবং যাত্রী আর যেতে না চাইলে, যাত্রার বাকি অংশের অর্থ ফেরত চাইতে পারবেন।
প্রয়োজন হলে তাকে প্রথম যাত্রাস্থলে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা এয়ারলাইনস নিজ খরচে করতে পারে।
কেএলএমের নীতিমালায় ফ্লাইট বিলম্বের জন্য ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের তুলনায় গন্তব্যে পৌঁছাতে ৩ ঘণ্টা বা তার বেশি দেরি হলে যাত্রী ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ কী, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
এয়ারলাইনস যদি সব ধরনের যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা নিয়েও বিলম্ব এড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে সে ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য হবে না।
ক্ষতিপূরণের অর্থ বিমানবন্দরে দেওয়া হয় না। এজন্য এয়ারলাইনসের কাস্টমার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
যাত্রী ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুটি বিকল্পের মধ্যে বেছে নিতে পারেন—নন-রিফান্ডেবল ট্রান্সপোর্টেশন ক্রেডিট ভাউচার বা নগদ অর্থ।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস): স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনসের নীতিমালা অনুযায়ী, ফ্লাইট দেরি হলে এসএএস অ্যাপের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব যাত্রীকে জানানো হবে।
আরও যেসব সেবা পাবেন যাত্রীরা—
ফ্লাইট দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হলে, অপেক্ষার সময় অনুযায়ী যাত্রীদের খাবার ও পানীয় দেওয়া হবে।
ফ্লাইট দেরির কারণে বাড়ি ফিরে যেতে না পারলে বা রাতে থাকতে হলে হোটেলের ব্যবস্থা করা হবে। এক্ষেত্রে যাতায়াতের খরচও বহন করবে এয়ারলাইনসটি।
দুটি ফোন কলের খরচও দেবে এসএএস।
তবে এসব ক্ষেত্রে যাত্রীকে সব বিল বা রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে।
ফ্লাইট দেরির কারণে কোনো যাত্রী ফ্লাইট মিস করলে, এসএএস তাকে কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই পরবর্তী ফ্লাইটে পুনরায় বুক করে দেবে।
ফ্লাইট ৫ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে এবং যাত্রী আর ভ্রমণ করতে না চাইলে, তাকে অব্যবহৃত টিকিটের পুরো অর্থ দেওয়া হবে।
লুফথানসা এয়ারলাইনস: এটি জার্মান এয়ারলাইনস। এর যাত্রীসেবা নীতিমালা মূলত ফ্লাইটটি কতো দূরত্বে যাচ্ছে এবং কতক্ষণ বিলম্ব হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে ঠিক করা হয়।
ফ্লাইট ৫ ঘণ্টার কম সময় দেরি হলে যাত্রীরা অপেক্ষার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবার ও পানীয়, প্রয়োজন হলে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ও যাতায়াত খরচ, দুটি সংক্ষিপ্ত ফোন কল করা বা দুটি ফ্যাক্স বা ই-মেইল পাঠানোর সুযোগ পাবেন।
ফ্লাইট ৫ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে, ৭ দিনের মধ্যে টিকিটের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিধান রয়েছে।
যত দ্রুত সম্ভব প্রথম যাত্রাস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রিটার্ন ফ্লাইটের ব্যবস্থাও করা হবে।
তবে এর নীতিমালায় যেসব পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য হবে না তাও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
• খারাপ আবহাওয়া
• রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
• ধর্মঘট
• নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি
• বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় অপ্রত্যাশিত সমস্যা
থাই এয়ারওয়েজ: থাইল্যান্ডের ক্যাব (সিএবি) রেগুলেশন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের ফ্লাইটের নির্ধারিত উড্ডয়ন সময়ের চেয়ে ২ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে সেটিকে বিলম্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যাত্রীদের যেসব সেবা দেওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে—অপেক্ষার সময় অনুযায়ী খাবার ও পানীয়, প্রয়োজন হলে হোটেল, বিমানবন্দর ও হোটেলের মধ্যে যাতায়াতের খরচ, প্রয়োজনীয় যোগাযোগের ব্যবস্থা—ফোন, ফ্যাক্স বা ইমেল।
থাই এয়ারওয়েজের নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হলে এবং যাত্রী ভ্রমণ চালিয়ে যেতে না চাইলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভাড়ার অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
পাঁচ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে এবং যাত্রা চালিয়ে যেতে না চাইলে রিফান্ডের সুযোগ রয়েছে।
১০ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে আরও নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।
বিলম্ব হওয়ার পর ১৪ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যাত্রীর সম্মতিতে নগদ অর্থের পরিবর্তে ক্রেডিট শেল, ট্রাভেল ভাউচার বা ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ার মাইলেজ দেওয়া যেতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বিমানও ফ্লাইট দেরি বা বাতিল হলে যাত্রীদের এ ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে।
তবে সেসব সেবা কীভাবে দেওয়া হয় বা এসব ক্ষেত্রে যাত্রীদের করণীয় কী, তা জানতে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ও বিপণন বিভাগের পরিচালককে ফোন করা হলেও তারা ধরেননি। উৎস: ডেইলি স্টার।