ত্বকের বয়স রুখতে, বলিরেখা দূর করতে এবং তারুণ্য ধরে রাখতে আধুনিক রূপচর্চার দুনিয়ায় ‘রেটিনল’-কে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা সেরা উপাদান মনে করা হয়।
তবে রাতারাতি উজ্জ্বল ও দাগহীন ত্বক পাওয়ার আশায় অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণে বা প্রতিদিন এই উপাদানটি মুখে মেখে ফেলেন।
পুষ্টি ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, রেটিনল শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান, যা অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহার উপকারের চেয়ে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি বেশি করে।
‘রিয়েল সিম্পল ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রেটিনল ব্যবহারের কারণে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাবলয় বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ মারাত্মকভাবে ভেঙে যেতে পারে।
এক মটরদানার নিয়মই আসল সত্য
অনেকেই টিকটক বা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে মুখের প্রতিটি অংশে বেশি করে রেটিনল ক্রিম ব্যবহার করেন।
নিউ ইয়র্ক সিটির শাফার ক্লিনিকের বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডেন্ডি এঙ্গেলম্যান স্পষ্ট করে বলেন, “বাজারের সাধারণ যেকোনো ‘ওটিসি’ বা দোকানে পাওয়া যায় এমন রেটিনল ফর্মুলার জন্য মাত্র একটি মটরদানা পরিমাণ ক্রিমই পুরো মুখের জন্য যথেষ্ট।”
অতিরিক্ত মাখলে কোষের কার্যকারিতা দ্রুত বৃদ্ধি পায় না, বরং ত্বকের জ্বালাপোড়া তৈরি হয়।
প্রেসক্রিপশন-স্ট্রেন্থ বা কড়া রেটিনয়েডের ক্ষেত্রে একটি মসুর ডালের দানার মতো আরও ক্ষুদ্র বা সূক্ষ্ম বিন্দুর আকার ব্যবহার করা নিরাপদ।
অতিরিক্ত ব্যবহারের ৫টি প্রধান লক্ষণ
ত্বকে অতিরিক্ত রেটিনল ব্যবহার করা হলে শরীর ৫টি সংকেতের মাধ্যমে এর ক্ষতি প্রকাশ করে।
তীব্র লালচে ভাব ও র্যাশ: মুখের সাধারণ উজ্জ্বলতার বদলে ত্বক অস্বাভাবিক লাল হয়ে ওঠে।
অনবরত চামড়া ওঠা বা খোসা ছাড়া: ত্বক শুষ্ক হয়ে প্রতিনিয়ত মরা চামড়া বা খড়ি ওঠার মতো অবস্থা হয়ে যায়।
তীব্র জ্বালাপোড়া ও আর্দ্রতা হ্রাস: সাধারণ কোনো ময়েশ্চারাইজার মাখলেও মুখ প্রচণ্ড চুলকায় বা সুঁই ফোটার মতো জ্বলে।
হঠাৎ তীব্র ব্রণ: অনেকেই মনে করেন ত্বক পরিষ্কার হওয়ার প্রাথমিক ধাপে ব্রণ বের হচ্ছে। তবে চিকিৎসকদের মতে এটি আসলে কেমিক্যালের অতিরিক্ততার কারণে তৈরি হওয়া র্যাশ বা প্রদাহ।
বড় লোমকূপ ও অকাল বার্ধক্যের ছাপ: যুক্তরাষ্ট্রের মারমুর মেডিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এলেন মারমুর সতর্ক করে বলেন, “মাত্রাতিরিক্ত রেটিনল ব্যবহারের ফলে মুখের লোমকূপগুলো আকারে অনেক বড় দেখায় এবং ত্বক প্রাকৃতিকভাবেই বুড়িয়ে গিয়ে বেশি বয়স্ক বা শুষ্ক দেখায়।”
নতুনদের জন্য সপ্তাহে দুদিনের নিয়ম
রেটিনল ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুরুতেই প্রতিদিন মাখা ভুল অভ্যাস।
ডা. এঙ্গেলম্যানের পরামর্শ অনুযায়ী, “যারা প্রথমবার রুটিনে রেটিনল যোগ করছেন, তারা প্রথম দুই সপ্তাহ কেবল সপ্তাহে দুই রাত এটি ব্যবহার করবেন। ত্বক যদি এটি ভালোভাবে সহ্য করতে পারে, তবে পরে একরাত পর পর মাখা যেতে পারে।”
নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক অভ্যস্ত হয়ে গেলে, সর্বোচ্চ সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ রাত এটি ব্যবহার করাই ভালো ফলাফল ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট।
শুষ্ক ত্বক বনাম ‘রেটিনল স্যান্ডউইচ’ কৌশল
ত্বকের সংবেদনশীলতা এবং পানির উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ২টি নিরাপদ পরামর্শ দেন।
পুরোপুরি শুষ্ক ত্বক: ডা. ডেন্ডি এঙ্গেলম্যানের মতে, “মুখ ধোয়ার পর ত্বক যখন সামান্য ভেজা থাকে, তখন রেটিনল মাখলে তা ত্বকের অনেক গভীরে দ্রুত প্রবেশ করে, যা তীব্র জ্বালাপোড়া বাড়ায়। তাই মুখ ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মুছে সম্পূর্ণ শুষ্ক বা ড্রাই ত্বকে রেটিনল লাগানো সবচেয়ে নিরাপদ।”
রেটিনল স্যান্ডউইচ: যাদের ত্বক প্রাকৃতিকভাবেই অনেক পাতলা বা শুষ্ক, তাদের প্রথমে মুখে একটি হালকা ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। এর ওপর এক মটরদানা রেটিনল মেখে পুনরায় ময়েশ্চারাইজারের স্তর দিয়ে ‘লক’ করতে হবে।
এই দ্বিমুখী স্তর কেমিক্যালের তীব্রতা কমিয়ে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ত্বক সুরক্ষিত রাখে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
রেটিনল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘমেয়াদী কষ্ট বা অস্বস্তি সহ্য করে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ত্বক অতিরিক্ত টানটান, লাল বা খসখসে মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
দামি বা চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে না ছুটে সঠিক পরিমাপ, ঘন ঘন না মাখা এবং ধৈর্য বজায় রাখাই সুস্থ ও উজ্জ্বল ত্বক পাওয়ার উপায়।